আজকাল ওয়েবডেস্ক: বর্ণবৈষম্যের অভিযোগে ধারাভাষ্য ছেড়েছেন লক্ষ্মণ শিবরামকৃষ্ণণ। 

রবি শাস্ত্রী জাতীয় দলের কোচ হওয়ার পরে তিনি ভেবেছিলেন, টস, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁকে পাঠানো হবে। কিন্তু শিবরামকৃষ্ণণ থেকে গেলেন পর্দার আড়ালেই। 

অভিমানে, দুঃখে শিবরামকৃষ্ণণ ধারাভাষ্যই ছেড়ে দেন। 

১৯ বছর বয়সে বিশ্বজয় করে নিয়েছিলেন শিবরামকৃষ্ণণ। আর ২২ বছরেই তিনি দৃশ্যপট থেকে উধাও। সবাই বলেছিলেন, শিবরামকৃষ্ণণ নিজের ছন্দ হারিয়ে ফেলেছেন। তাঁর লুপ হারিয়ে গিয়েছে। এমনকী শৃঙ্খলা ভেঙেছিলেন বলেও শিবরামকৃষ্ণণের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল। 'শিবা' মদ্যপান করেন, এমন অভিযোগও করা হয়। 

কিন্তু শিবরামকৃষ্ণণের আসল কাহিনি কিন্তু কোনও স্কোরকার্ডে লেখা নেই। ১৯৮৫ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে শিবরামকৃষ্ণণের ঘূর্ণি বুঝতে পারেননি ব্যাটাররা। তখনও ব্যাটার শব্দটা ক্রিকেটে আসেনি। ১৬ বছর বয়সে মুম্বই হোটেলের বাইরে দাঁড়িয়ে কেঁপেছিলেন শিবা। গেটকিপার ভাবতেও পারেননি শ্যাম বর্ণের অধিকারী এক বালক জাতীয় দলের ক্রিকেটার হতে পারেন। এক সাক্ষাৎকারে শিবরামকৃষ্ণণ জানিয়েছেন এই মর্মান্তিক ঘটনার কথা। 

১৭ বছর ১১৮ দিনে শিবার টেস্ট অভিষেক ঘটেছিল। সময়টা ১৯৮৩। ১৯৮৪-৮৫ মরশুমে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ঘরোয়া সিরিজে ফর্মের চুড়োয় পৌঁছেছিলেন শিবরামকৃষ্ণণ। মুম্বইয়ে ১২টি উইকেট নিয়েছিলেন শিবা। 

১৯৮৫ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ক্রিকেটবিশ্ব দেখল শিবরামকৃষ্ণণের আবির্ভাব ঘটেছে। সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী হয়েছিলেন তিনি। ভারত সেবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ১০টি উইকেট নিয়েছিলেন শিবা। 

২১ বছর বয়সে শিবরামকৃষ্ণণের টেস্ট কেরিয়ার শেষ হয়ে যায়। তাঁর নামের পাশে লেখা ছিল ২৬টি উইকেট। অথচ সুনীল গাভাসকর থেকে শুরু করে অনেক কিংবদন্তি ধরেই নিয়েছিলেন শিবার ঝুলিতে থাকবে পাঁচশোটি উইকেট। 

১৪ বছর বয়সে স্কুল ইউনিফর্ম পরিহিত শিবরামকৃষ্ণণ চিপকে নেট বোলার ছিলেন। জাতীয় দলের ড্রেসিং রুমে তাঁকে গ্রাউন্ডসম্যান হিসেবে গুলিয়ে ফেলেন এক সিনিয়র ভারতীয় ব্যাটসম্যান। সেই সিনিয়র ব্যাটার জুতো পরিষ্কার করে দিতে বলেছিলেন শিবাকে। 

সেই সিনিয়র ক্রিকেটারের মুখের উপরে শিবরামকৃষ্ণণ বলে দিয়েছিলেন, ''এটা আমার কাজ নয়।'' 

১৭ বছর বয়সে জাতীয় দলের হয়ে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন শিবরামকৃষ্ণণ। সুনীল গাভাসকর ছিলেন তাঁর ফ্রেন্ড, ফিলোজফার অ্যান্ড গাইড। এই বয়সে জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার মুহূর্ত স্মরণীয় করে রাখার জন্য কেক আনতে বলেছিলেন সানি। 

এক টিমমেট মজা করে বলেছিলেন,''এই সানি, তুমি ঠিক রংয়েরই কেক আনতে বলেছিলে। ডার্ক চকোলেট কেক ইর আ ডার্ক বয়।'' 

কাঁদতে কাঁদতে সেই কেক কেটেছিলেন শিবরামকৃষ্ণণ। 

আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে গোটা ক্রিকেটবিশ্ব শিবা-ম্যানিয়ায় ভুগত। সময়টাই ছিল শিবরামকৃষ্ণণের। মুম্বই, জলন্ধর বা পাকিস্তানের মাটিতে খেলতে নেমে তাঁকে শুনতে হয়েছিল কালিয়া শব্দ। আম্পায়ার শাকুর রানা তাঁকে নাজেহাল করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত গাভাসকর এগিয়ে এসেছিলেন শিবাকে বাঁচাতে। তিনি বলেছেন, ''আমার শরীরের রংয়ের জন্য মানুষ আমাকে বর্জন করেছিল। যখনই এই বিষয়গুলো ঘটত, তখনই আমি ভেঙে পড়তাম মানসিক দিক থেকে। আমি সব ভুলে যেতে চাইতাম। কিন্তু গভীরে তা রয়ে যেত।'' এই সব অভিজ্ঞতা মন, আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিয়েছিল শিবরামকৃষ্ণণের। 

কিন্তু ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে গিয়ে সান্ত্বনা পেতেন শিবরামকৃষ্ণণ। ম্য়ালকম মার্শাল, ডেসমন্ড হেইন্স, গর্ডন গ্রিনিজদেরও গায়ের বর্ণ শ্যমলা। কথিত রয়েছে, নিজের ড্রেসিং রুমের থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাজঘরে থাকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন শিবা। 

 

 

+