সম্পূর্ণা চক্রবর্তী: ২২ বছর আগের সেই দিন।মে মাসই ছিল। শেষবার জাতীয় লিগ জেতে ইস্টবেঙ্গল। তারপর আর কোনও সর্বভারতীয় ট্রফি ক্লাবে ঢোকেনি। জাতীয় লিগের নাম বদলে হয় আই লিগ। কিন্তু ট্রফি অধরা। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আইএসএল চলছে। কিন্তু লাল হলুদের ভাগ্য খোলেনি। বহু কোচ এসেছে, বহু গিয়েছে, কিন্তু ভাগ্য ফেরেনি। সর্বভারতীয় ট্রফির ভাড়ার সেই শূন্য। কল্পতরুর মতো এসেছেন অস্কার ব্রুজো। দুই দশকের বেশি সময়ের খরা কাটিয়ে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। ইতিহাসকে ছুঁতে আর মাত্র কয়েকঘণ্টার অপেক্ষা। লাল হলুদ জার্সিতে শেষবার যারা জাতীয় লিগ জয়ের স্বাদ পেয়েছিল, সেই দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন দীপক মণ্ডল। দুই প্রধানে সমানতালে খেলায়, গায়ে লাল হলুদের স্ট্যাম্প নেই ঠিকই। কিন্তু ইস্টবেঙ্গলের হয়ে শেষবার সর্বভারতীয় ট্রফি জয়ের সেই দিনটি এখনও স্মৃতিতে টাটকা।
দীপক বলেন, 'আমরা পরপর দু'বার জিতেছিলাম। তারপর মাঝে একবছর জিতিনি। আবার ২০০৩ সালে জাতীয় লিগ পাই। ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান টিম করত জেতার জন্য। ক্লাবে ফুটবলার, কোচ, কর্মকর্তা ছাড়াও একটা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ সাপোর্টার। ওদের আনন্দ দিতে পেরে খুব ভাল লাগে। যা বলে বোঝানো যায় না। এবার জিততে পারলে খুবই ভাল। অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। ইস্টবেঙ্গল জিতেই চ্যাম্পিয়ন হবে। দল যেমন খেলছে, জেতাই উচিত।' কমজোরী প্রতিপক্ষ ইন্টার কাশী। কোচের হটসিটে আছেন ইস্টবেঙ্গলেরই প্রাক্তনী। লাল হলুদ জার্সিতে জাতীয় লিগ জেতা দীপক মনে করছেন, প্লেয়ারদের তাগিদই পার্থক্য গড়ে দেবে। দীপক বলেন, 'এখনকার প্লেয়ারদের মানসিকতা আলাদা থাকে। আমাদের সময় আলাদা ছিল। আজকের দিনে যদি প্লেয়াররা সবকিছু ভুলে নিজেদের সবটা উজাড় করে দেয়, তাহলে পজিটিভ রেজাল্ট হবে। সবটাই প্লেয়ারদের ওপর। কোচ নিজের কাজ করে দিয়েছে।'
মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের পর সুভাষ ভৌমিক। বিদেশি কোচের হাত ধরে লিগ প্রবেশ করেনি তাঁবুতে। প্রথমবার তেমন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এমন দিনে সুভাষ স্যারের কথা মনে পড়ছে দীপকের। জানিয়ে দিলেন, আইএসএল জিততে অস্কারের জন্য খেলতে হবে প্লেয়ারদের। দীপক বলেন, 'সুভাষ স্যারের ম্যান ম্যানেজমেন্ট খুবই ভাল ছিল। উনি খুব ভাল প্লেয়ার বাছাই করতেন। অর্ধেক কাজ উনি করতেন, বাকিটা প্লেয়াররা করে দিত। আমরা ক্লাবের জন্য খেলতাম। কিন্তু প্লেয়াররা যখন কোচের জন্য খেলে, সেই টিম রেজাল্ট পায়। ভৌমিক স্যার, মিস্টার বব হাউটন বলুন। এদের জন্য আমরা যখন খেলতাম, রেজাল্ট পেতাম। ক্লাব তো আছেই। সেই জন্যই আমরা আছি। তবে মোটিভেশন এবং ম্যান ম্যানেজমেন্ট পার্থক্য গড়ে দেয়।'
অস্কারের সঙ্গে মত বিরোধ হয়েছে তাঁরই তিন প্রাক্তন সতীর্থ সন্দীপ নন্দী, রহিম নবি এবং অ্যালভিটো ডি'কুনার। তাই স্প্যানিশ কোচের ম্যান ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কোনও কথা বলতে চাননি দীপক। তবে খেতাব দৌড়ে পৌঁছনোর জন্য ব্রুজোকে সাবাশি দিলেন। তার প্রধান কারণ, মরশুম শুরুতে ভাল দল গঠন। দীপক বলেন, 'প্লেয়ার ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কোনও মন্তব্য করব না। তবে ফুটবলার বাছাই খুবই ভাল হয়েছে। দু'মাস আগে অস্কারের সঙ্গে আমার একটা অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছিল। আমি ওকে বলেছিলাম, খুব ভাল প্লেয়ার নিয়ে এসেছ। এখনকার ফুটবলে যদি টিম ভাল থাকে, প্লেয়ার ভাল থাকে, রেজাল্ট আসবে। আগের বছরগুলোতে ইস্টবেঙ্গল কী দল করেছে! এবার ভাল প্লেয়ার এনেছে। মোহনবাগান দলও ভাল। দুই দলের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য নেই।' গত এক দশকে কলকাতার ক্লাব বলতে ভারতীয় ফুটবলে সাফল্য পেয়েছে শুধুমাত্র মোহনবাগান। খেতাব লড়াইয়ে সবুজ মেরুনের প্রতিপক্ষ থাকত মুম্বই সিটি এফসি, বেঙ্গালুরু এফসি, পাঞ্জাব এফসি ইত্যাদি। দীর্ঘ বছর পর চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য লড়ছে কলকাতার দুই প্রধান।
অনেকেই মনে করছেন, ইস্টবেঙ্গল চ্যাম্পিয়ন হলে, ভারতীয় ফুটবলের মানচিত্রে বদল আসবে। আরও এগিয়ে যাবে বাংলার ফুটবল। অবশ্য তেমন মত পোষণ করছেন না দীপক। দাবি, বিশেষ পার্থক্য গড়ে দেবে না। যে তিমিরে আছে, সেই তিমিরেই থাকবে। দীপক বলেন, 'ভেবে দুঃখ হয় মোহনবাগান এবং ইস্টবেঙ্গলে কটা বাঙালি খেলে? আমার মনে হয়, আইএসএল জিতলেও বাংলার ফুটবলে খুব প্রভাব পড়বে না। যদি পড়ে তাহলে ভাল। কিন্তু এটা ক্লাব ভিত্তিক লিগ। একটা ক্লাব জিতবে। সার্বিকভাবে বাংলার ফুটবলে কতটা প্রভাব পড়বে জানি না।' কিশোর ভারতীতে যাচ্ছেন না, খেলা দেখবেন টিভির পর্দায়। তবে পুরোনো দলের জন্য প্রার্থনা জারি থাকবে দীপকের।















