সম্পূর্ণা চক্রবর্তী: খেলা শেষ হওয়ার আগেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। চলতি বছর প্রথম শিলাবৃষ্টি দেখল কলকাতা। তার কিছুক্ষণ আগেই সল্টলেকের জিডি গ্রাউন্ডে আছড়ে পড়ে ঝড়। সেই ঝড়ের নাম অ্যানি তায়াং। এক, দুই বা তিন নয়, গুণে গুণে সাত গোল করেন অরুণাচলের মহিলা ফুটবলার। অনেকেই হয়ত বলবে, মেয়েদের ফুটবলে ভুরি ভুরি গোল হয়। কিন্তু একাই সাত গোল করা মোটেই সহজ নয়। সে যে স্তরের ফুটবল হোক না কেন, প্রতিপক্ষ যেই হোক না কেন। তারওপর এমন পরিস্থিতিতে। ১ এপ্রিল মাতৃবিয়োগ হয় অরুণাচলের ২৩ বছরের ফুটবলারের। খবর পাওয়া মাত্র ফিরে যান অরুণাচলে।‌ ২০ মার্চ পর্যন্ত বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে কাটান। তারপর ফেরেন কলকাতায়। আবার ফেরেন ফুটবলে। ব্যক্তিগত জীবনের এই বড় ঝড় সামলে দায়বদ্ধতার টানে দু'দিনের মধ্যে নেমে পড়েন কন্যাশ্রী কাপের প্রথম ম্যাচ খেলতে। ২৩ মার্চ চাঁদনী স্পোর্টিংয়ের বিরুদ্ধে গোল পাননি। তবে নজর কাড়েন।

ফর্সা, ছিপছিপে, ছোট-খাট চেহারা। ছোট চুল। যাকে বলে বয়েজ কাট। পায়ের কাজ ভাল। গোল চেনেন। তবে প্রচণ্ড লাজুক। কথা বলতেই চান না। কিন্তু কন্যাশ্রী কাপের ম্যাচে সাত গোল করার পর কি আর প্রচারের আলো থেকে পুরোপুরি লুকিয়ে থাকা যায়? অবশেষে নিমরাজি হয়েই মিনিট দুয়েক কথা বলার অনুরোধ রাখেন ম্যাচের সেরা। ফুটবলজীবনে সেরা পারফরমেন্স। এমন দিনে সদ্য প্রয়াত মাকে মনে পড়ছে অ্যানির। কান্না আটকাতে পারলেন না। মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে যখন সাত গোলের অনুভূতির কথা বলছিলেন, চোখ দিয়ে সমানে জল গড়িয়ে পড়ে। কথা বলতে বলতেই দু'একবার হাত দিয়ে চোখ মোছেন। সঙ্গে আফশোস, এই দিনটা যদি মা দেখতে পেতেন! মায়ের উদ্যোগেই ফুটবলে আসা। মায়ের সঙ্গে যেদিন শেষ কথা হয়, সেদিনও ফুটবলে মনোযোগ দিতে বলেন। বলেন, ফুটবল নিয়ে এগিয়ে যেতে। বড় ফুটবলার হতে। সাফল্যের দিনে এই কথাগুলো কানে বাজছিল অরুণাচলের মহিলা ফুটবলারের। 

অ্যানি বলেন, 'অবশ্যই সাত গোল করে খুবই ভাল লাগছে। সতীর্থ, কোচ, সাপোর্ট স্টাফদের জন্য হয়েছে। ওদের ধন্যবাদ। দারুণ অনুভূতি। গর্ববোধ হচ্ছে। ভাবিনি কোনওদিন এক ম্যাচে সাত গোল করব। কিন্তু করে ফেললাম। সম্প্রতি আমার জীবনে খুবই দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে। আমি মাকে হারিয়েছি। মাঠে ফেরা সহজ ছিল না। কিন্তু মায়ের কথা মতো ফুটবলকে সম্বল করে এগোনোর চেষ্টা করছি। মা আজকের দিনটা দেখতে পেলে ভাল লাগত। আমাকে ফুটবলে আসার অনুপ্রেরণা জোগায় মা। সবসময় বলত, এগিয়ে যাও। বড় প্লেয়ার হও। এই সাফল্য আমি মাকে উৎসর্গ করছি।' মায়ের বিয়োগের পর বাবা এবং তিন বোন, এক ভাইকে নিয়ে সংসার। লোহিত ডিস্ট্রিক্টের তেজুর বাসিন্দা। বাবা পিওন। 

কলকাতায় এটাই অ্যানির প্রথম বছর।গতবছর আইডব্লিউএল টুয়ে খেলা কাই রুমির হাত ধরে এই শহরে আসা। বর্তমানে অরুণাচল প্রদেশের দুই ফুটবলারই ইউনাইটেড কলকাতা স্পোর্টস ক্লাবের সদস্য।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে অ্যানির আদর্শ লিওনেল মেসি। ভারতীয় মহিলা ফুটবলারদের মধ্যে বালা দেবী। লক্ষ্য জাতীয় দলে খেলা। কন্যাশ্রী কাপে ভাল খেলে নজরে পড়তে চান। তবে নির্দিষ্ট কোনও ব্যক্তিগত টার্গেট নেই। সকলের সমর্থনে ভাল ফুটবলার হওয়া লক্ষ্য। অ্যানি বলেন, 'আমি ভাল প্লেয়ার হতে চাই। আরও উন্নতি করতে চাই। তারজন্য কঠোর পরিশ্রম করব। দল সবসময় সমর্থন করে। কোচেরাও সর্বত্র পাশে থাকে।' 

ম্যাচ শেষে পাহাড়ি ফরোয়ার্ডের ভূয়সী প্রশংসা করেন ইউকেএসসির কোচ প্রশান্ত ভট্টাচার্য। জানান, অ্যানির প্রতিভা সম্বন্ধে অবগত ছিলেন। ছাত্রী যে এদিন ভাল খেলবে, তাঁর আগাম আভাস পেয়েছিলেন। প্রশান্ত ভট্টাচার্য বলেন, 'অ্যানি খুবই ভাল প্লেয়ার। কোয়ালিটি প্লেয়ার। ১ মার্চ ওর মা প্রয়াত হয়। ২০ তারিখ পর্যন্ত ছিল না। এখনও পুরোপুরি ফিট নয়। আগের ম্যাচে আমি কম সময় খেলিয়েছিলাম। ম্যাচ টাইম দেওয়ার জন্য এদিন বেশিক্ষণ খেলাই। আমি জানি ও গোল করতে পারে। ম্যাচ শুরুর আগেই ওকে বলেছিলাম, আজকে তুমি হ্যাটট্রিক করবে। সেখানে সাত গোল করেছে। খুবই ভাল লাগছে।' আনন্দের দিনেও যেন বিষাদের সুর। বৃষ্টির পর আবার প্রকৃতি স্বাভাবিক হলেও, শূন্যতা যেন গ্রাস করে উঠতি মহিলা ফুটবলারকে। ড্রেসিংরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে চেয়ে ছিলেন মাঠের দিকে। বোধহয় ভাবছিলেন, 'সময়টা যদি থামিয়ে দিতে পারতেন..।'