বুড়োশিব দাশগুপ্ত
কিছু ভাল, কিছু মন্দ ইত্যাদি নানা কারণে অনেকের চোখ পড়েছে পশ্চিমবঙ্গে। নির্বাচনে হেরে যাওয়ার এক মাসের মধ্যেই একটি গোটা রাজনৈতিক দলের ভেঙে পড়া খুব কমই দেখা যায়। দলের অল্প কয়েকজন নির্বাচিত সদস্যরা দলের প্রতিষ্ঠাতাকে অস্বীকার করে একটি নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। জনগণের রায় যেন অপ্রাসঙ্গিক।
বিপুল প্রত্যাশার চাপের মধ্যেই ক্ষমতায় আসা দল তাদের প্রথম বাজেট পেশ করেছে। রাজ্য আট লক্ষ কোটি টাকার বিশাল ঋণের বোঝায় জর্জরিত ছিল। যা শোধ করতে প্রতি বছর রাজ্যের আয়ের ২০ শতাংশ খরচ হয়ে যাবে। কেউ জানে না কত বছর লাগবে শোধ করতে। যে রাজ্য একসময় দেশের জিডিপিতে ৩০ শতাংশ অবদান রাখত, এখন তার অবদান ৩ শতাংশেরও কম। দেশভাগ, মাল পরিবহন শুল্কের ভাগ, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং অবশেষে ‘কাটমানি’ অর্থনীতির মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া ‘পুঁজি পাচারের’ এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। বাংলা এসবই দেখেছে।
‘দক্ষিণপন্থী’ অর্থনীতিবিদরা এতদিন ধরে ‘বামপন্থী’দের রাজ্যকে ‘হত্যা’ করার জন্য দায়ী করে এসেছেন। এখন নিজেদের ‘সঠিক’ প্রমাণ করার পালা তাদের। ‘ডবল ইঞ্জিন’ ব্যবস্থা চালু থাকায়, রাজ্যের হাল পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টার জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত সময় আর হতে পারে না। ৫০ বছরের দীর্ঘ কেন্দ্র-রাজ্য দ্বন্দ্বের অবশেষে অবসান ঘটেছে। নীতি আয়োগে অশোক লাহিড়ী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সঞ্জীব সান্যাল এবং রাজ্যে অর্থমন্ত্রী হিসেবে স্বপন দাসগুপ্ত বাঙালি ব্যক্তিত্বদের এই ‘ত্রিভুজ’ কাজটি করবেন বলে আশা করা হচ্ছে, অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আশীর্বাদ নিয়ে।
প্রথম উদ্যোগ দেখা গিয়েছে রাজ্য বাজেটে। এক লক্ষ চাকরি। ২০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা। শিল্পে অনুদান হিসেবে ৫০০০ কোটি টাকা। শহরে জমির সর্বোচ্চ সীমা আইনের সংশোধন। ‘কাটমানি’র বিরুদ্ধে কঠোর আইন। জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলি অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি অঙ্গনওয়াড়িগুলি লাভবান হয়, তেমনি সরকারি কর্মী, শিক্ষক, মিড ডে মিল প্রকল্পের আওতাধীন শিশু, হাসপাতালের রোগী এবং কৃষকদের দিকটিও খেয়াল রাখা হয়েছে। সম্ভবত একমাত্র বাদ পড়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা মুদ্রাস্ফীতির কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগেন।
রাজ্যবাসী দৃশ্যত বাজেট নিয়ে খুবই খুশি। কিন্তু এই সমস্ত অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতির জন্য টাকা আসবে কোথা থেকে? কোনও অতিরিক্ত করের প্রস্তাব করা হয়নি। কেন্দ্র কি জিএসটি-তে কোনও পরিবর্তন আনবে? নাকি আমরা আরও মদের দোকান দেখতে পাব? এই সমস্ত প্রতিশ্রুতি কি রাজ্যের ঋণের বোঝা আরও বাড়িয়ে দেবে?
কিন্তু আমরা এখনও আশাবাদী। আমাদের দু’টি প্রধান মালবাহী করিডর রয়েছে, একটি বারাণসী থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত এবং অন্যটি গুজরাট থেকে শুরু হয়ে ডানকুনি পর্যন্ত। কলকাতা বিমানবন্দরকে শক্তিশালী করার জন্য কল্যাণীর কাছে আমাদের আরও একটি গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দর হচ্ছে, সঙ্গে আরও কয়েকটি ছোট বিমানবন্দরও থাকছে। এবং সবশেষে, পূর্ব মেদিনীপুরে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর। উত্তরবঙ্গ এই সাফল্যের একটি বড় অংশ পাচ্ছে— মেট্রো প্রকল্প, একটি আইআইটি, আইআইএম এবং একটি এইমস-এর মাধ্যমে। এটি প্রায় সান্তা ক্লজের আশীর্বাদের মতো।
রাজ্য অনেক দিন ধরেই ভুগেছে। দোষারোপের পালা আর চালিয়ে লাভ নেই। বামফ্রন্ট বলেছিল কেন্দ্র (এবং কংগ্রেস) রাজ্যের জন্য কিছুই করেনি, তৃণমূল বলেছিল বামেরা কিছুই করেনি এবং অবশেষে, এখন আমরা নতুন বিজেপি সরকারের কাছ থেকে শুনছি যে তৃণমূলও কিছুই করেনি। এ বার সামনে তাকানোর সময়।
কৌশলগতভাবে, ভারতের জন্য পশ্চিমবঙ্গকে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য হয়ে উঠতে হবে, যদি ভারত ‘লুক ইস্ট’ নীতি বাস্তবায়িত করতে চায়, যেখানে কলকাতা হবে কেন্দ্রবিন্দু। বাংলাদেশে এখন আর আমাদের এমন কোনও ‘বন্ধুত্বপূর্ণ হাসিনা’ নেই যাঁর সঙ্গে সবকিছু হালকাভাবে নেওয়া যায়। যদি চীন বাংলাদেশের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে (যা করার চেষ্টা তারা করছে) তাহলে ভারত বিপদে পড়বে। বাংলাদেশকে সন্তুষ্ট রাখাটাই উত্তম কূটনীতি এবং এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তিস্তার জলের বিষয়টি (যা মমতা সরকারের আমলে একটি বড় বিবাদের কারণ ছিল) এখন সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে সমাধান করা যেতে পারে। এছাড়াও, ২০২৭ সালে ফরাক্কা জল চুক্তি নতুন করে কথা রয়েছে। গঙ্গা-পদ্মার জলবণ্টন নিষ্পত্তির জন্য সেই বিষয়টিও কূটনৈতিকভাবে সমাধান করা সম্ভব।















