উদ্দালক
কৌশিক কর আমার অনেকদিনের বন্ধু। পরিচিতির গণ্ডী পেরিয়ে তাঁকে লড়াই করতে দেখেছি, দেখেছি কী ভাবে তিনি ক্রমে বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে একটি স্থান করে নিয়েছেন। সেই কৌশিকের নাট্যচর্চার যাত্রাপথের বিভিন্ন ধাপে তাঁর কৃৎকৌশলের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। অভিনেতা ও পরিচালক হিসাবে তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী। আগাগোড়া শিল্পী হিসাবে তিনি যে যাপনের সঙ্গে যুক্ত, সেখানে ফাঁকি নেই, তাঁর শিল্পে সে কথা ধরা পড়ে। এবার অনেকদিন পর যখন কৌশিকের কাজ দেখতে গেলাম অ্যাকাডেমি অফ ফাইনার্টস-এ, তখন স্বাভাবিক ভাবে আশা বেশি ছিল, আকাঙ্খা বেশি ছিল। কারণ, তাঁর শিল্পের পাগলামি আগাগোড়া সত্যির কাছাকাছি তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে, এবারেও তা দেবে, ভেবছিলাম।
হ্যাঁ, আশাহত হতে হয়নি। সময়, বয়স পেরিয়েও তিনি যে বিপুল দক্ষতার অন্দরে নিজেকে ধরে রেখেছেন, অভিনেতা হিসাবে এবং পরিচালক হিসাবে, সেটা আবারও প্রমাণিত হয়েছে। এই নাটকটি দীর্ঘ। এই অমনযোগী সময়ে তিনি একটি নাটক নির্মাণ করেছেন যা প্রায় ২ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটের, সেই কারণেই প্রথমে তাঁকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। কারণ, 'দর্শক দেখবে না' বা 'অতক্ষণ ধৈর্য থাকবে না' ভেবে যে পরিচালকরা নাটকের দৈর্ঘ্য কমিয়ে নেন, তাঁরা আসলে দর্শকের মাপে নিজেকে বদলে ফেলতে চান, যেটা শিল্পীর কাছ থেকে কাম্য নয়। এক্ষেত্রে কৌশিক সেটা করেননি, বরং তিনি চেয়েছেন নিজের যতটুকু বলার, তার জন্য যতটা সময় লাগে, ততটা নেওয়ার, এবং এমন ভাবে নির্মাণ করার, যাতে দর্শক দীর্ঘ হলেও নাটকটি পুরোটা বসে দেখেন, মন দিয়ে দেখেন, তার জন্য যে স্কিল সেটে পৌঁছানো দরকার, অভিনেতাদের নিয়ে তিনি সেই স্কিল সেটে পৌঁছে গিয়েছেন।
'এবার খলনায়কের পালা' কাউন্টার ন্যারেটিভের গল্প। বিশ্বের বাজারে এই নিয়ে অসামান্য সব কাজ হলেও বাংলায় বা ভারতে তেমন করে কেউ কাজ করেননি। সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রান্তিক মানুষের একরকমের উপস্থিতি ধরা পড়লেও, আসলে সমাজের বাজে লোক, অপরাধপ্রবণ লোকেরা কেন প্রথাগত শিক্ষিতের শিল্পচর্চায় আসবে, এই নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা। নবারুণ ভট্টাচার্য-সহ বেশ কয়েকজন বাংলা সাহিত্যে কাউন্টার ন্যারেটিভের একটা শক্তিশালী চর্চার জায়গা তৈরি করেন। কথিত অপভাষাকে আরও মান্য ও আরও সাহিত্যিক অর্থে প্রয়োগ করেন। সেই কারণে নবারুণ বাংলা সাহিত্যের মোড় বদলে দেওয়া সাহিত্যিক। তেমন ভাবেই বাংলা নাটকের ক্ষেত্রেও এমন কাউন্টার ন্যারেটিভের নাটক এর আগে খুব একটা দেখেছি বলে মনে পড়ে না, ব্রাত্য বসুর অশালীন-সহ কিছু নাটকে এই ধারণা এলেও তাঁকে মান্য হিসাবে মানা হয়েছে বাংলা নাটকের ক্ষেত্রে, এমন নয়। কৌশিক সেই বেয়াড়া শিল্পী, যাঁর লাগামছাড়া শক্তি এই নাটকের অন্দরে প্রবেশ করিয়েছে আশ্চর্য হাইড্রোজেন বোমা, যা বাঙালির ন্যাকামিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।
নাটকে কৌশিক নিজে অভিনয় করেছেন অসামান্য দক্ষতায়। এছাড়াও তন্নিষ্ঠা অত্যন্ত ভাল অভিনেত্রী সেকথা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আবারও। দারুণ অভিনয় করেছেন সুজন। খলনায়ক কন্ডোমের তিন শাগরেদের মধ্যে একজন তিনি। সুজনকে আলাদা করে চিহ্নিত করতে পারেন দর্শকরা। অসাধারণ সঙ্গীতের কাজ করেছেন অভিজিৎ আচার্য। তিনি বাংলা নাটকে কার্যত অদ্বিতীয় সঙ্গীত নির্মাণকারী হিসাবে নিজেকে তুলে এনেছেন। তিনি নিজে অ্যাকাডেমির মঞ্চে যন্ত্রাণুসঙ্গে ছিলেন, সেই কারণে হয়ত আরও বেশি খোলতাই হয়েছে প্রযোজনার ধরণ। পাশাপাশি অন্য চরিত্রে টিনটিন, বিদেশ, অঙ্কিতা, চিরঞ্জিৎ, মৃণাল, নার্গিসও দারুণ অভিনয় করেছেন। আসলে এমন প্রোপাগান্ডা বা অসংখ্য জরুরি কথা নির্ভর নাটকে, যেখানে রাজনৈতিক অবস্থান, উচ্ছেদের সমস্যার মতো একাধিক বিষয় উঠে এসেছে, সেখানে কথাটা স্পষ্ট করে না তুলতে পারলে অভিনয় দর্শকের কাছে পৌঁছতে পারে না। কৌশিকের পরিচালনায় এবং 'শূন্য এবং নাট্যান্বেষী' প্রযোজিত এই নাটক দর্শকের কাছে পৌঁছে গিয়েছে তীব্রতায়। আলোক সঞ্চালনায় প্রিয়ব্রত চ্যাটার্জিও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছেন, এই দীর্ঘ নাটকে প্রায় কোনও সমস্যাহীন আলোর প্রয়োগ তাই দর্শককে আলাদা করে আনন্দ দেয়।
আবারও বলছি, প্রান্তিক মানুষের ভাষার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া সহজ নয়। অশালীনে যে তথাকথিত 'অপভাষা'র প্রয়োগ ছিল তাও প্রকৃত অর্থে প্রান্তিক মানুষের ভাষা নয়। বরং সেখানে মধ্যবিত্তের চেতনার সংকট ফুটে উঠেছিল। বাংলা থিয়েটার ফ্যাতাড়ুর হাত ধরে প্রথমবার বার পেয়েছিল ছোটলোকের গল্পকে, ছোটলোকের মতো করে। সেখানে ছিল না কোনও আগল, নগ্ন শহরের নগ্ন চেহারাটা স্পষ্ট করেছিলেন পরিচালক দেবেশ চট্টোপাধ্যায়। তিনি আগুনখেকো টেক্সটকে অকারণ বাঁধতে যাননি। কৌশিক, তেমনই একটি মৌলিক রচনার মধ্যে দিয়ে নিয়ে গেলেন দর্শকদের। সেখানে তিনিও মানলেন না কোনও বাধা। আসলে শহরের যে বিপুল সংখ্যায় মানুষ আলোর তলায় থেকে পিঁপড়ের মতো যাপন করেন জীবন, তাঁদের কথা, তাঁদের ভাষায় বাংলা নাটকে খুব একটা দেখা যায়নি, কৌশিক পরিচালনায় সেটা দেখালেন।















