অনুজয় চট্টোপাধ্যায়

‘মা, চিলি আর ইতালি দিয়ে কি রান্না হয়?’ সময়টা ’৯৮। এরপরই সময়ের লং জাম্প। নতুন শতাব্দী, নতুন সময়। আহারে আমার নয়ের দশক! মুখ টিপে হেসে কেউ বলবে, ভাল কিন্তু বড্ড গোবেচারা। আমার স্মৃতিতে থাকা প্রথম ওয়ার্ল্ড কাপ ম্যাচ চিলি বনাম ইতালি। রাতে খাওয়ার সময় খেলা শুরুর বাঁশি বাজল। সম্ভবত এই কারণেই দুই দেশের এ হেন নাম খাদ্যবস্তু ছাড়া আর কিছু ভেবে ওঠা যায়নি। আমার জার্সির তখন দুই রং, হলুদ আর লাল হলুদ। ব্রাজিল এবং ইস্টবেঙ্গল। ইস্টবেঙ্গল বাঙাল পরিবারের সোচ্চার অবস্থান। সে না হয় হল, কিন্তু অমন সদ্য মারাদোনা ঝড়ের পরও বাবা এবং বড় কাকা কী করে ব্রাজিল আঁকড়ে থাকল? মারাদোনা আমার স্মৃতিতে নেই। বুঝতে শেখার পর থেকে মারাদোনা ব্যাড বয় হয়ে গিয়েছেন বাড়িতে। নেহাৎ বামপন্থী পরিবারে ফিদেল কাস্ত্রোর সম্মান ছিল, না হলে নিশ্চিত পারিবারিক নির্দেশ আসতো,  মারাদোনার সঙ্গে মিশো না। 

আমার বাবা অলস এবং অসম্ভব দক্ষ ফুটবলার ছিলেন। এই দুটো পরস্পর বিরোধী শব্দ পাশাপাশি কীভাবে যেন বসে গেল। বাবা ফুটবল বুঝতেন, বোঝাতেন আমায়। আমার খেলা দেখতে শেখা বাবার কাছে। ক্রিকেট, ফুটবল, টেনিস। বাবার কাছে শেখা প্রতিপক্ষের পরাজয় উল্লাস থাকবে, তাঁকে অসম্মান করা থাকবে না। আমি ফুটবলের মরসুমী ফ্যান। কালার টিভি আর বেকহ্যাম এল বলে ইউনাইটেড। ওয়ার্ল্ড কাপ এল বলে ব্রাজিল। বাড়িতে কেবল টিভি নেওয়া হল, অ্যানিম্যাল প্ল্যানেট আর ইএসপিএন দেখা হবে বলে। সব কথা কি আর রাখা যায়? আফ্রিকার দৈত্য-দানো পরাস্ত করে আমার দিকে হেঁটে এলেন স্মিতা পাটিল। আমার জীবনের মির্চ মশালা। আমি ঘাসের জঙ্গলে শিকারের সন্ধানে ওত পাতা চিতার মতো উঠে দাঁড়ালাম, ‘মৌসমে ইশক মে মচলে হুয়ে আরমান হ্যায় হাম’। স্বতন্ত্র মতামত, স্বতন্ত্র অবস্থান হল আমার। বেকহ্যাম রিয়ালে চলে গেল। লা লিগা জনপ্রিয় হতে থাকল। আর এক ঝাঁকড়া চুলের মিস্টি হাসির ছটফটে যুবক আমার প্রাণের হলুদ জার্সিতে নীল সাদা রং ছিটিয়ে দিল। লিওনেল মেসি। 

‘ব্রাজিল যদি বলে চৌকো বলে খেলা হবে, তাহলে তাই হবে’। এ আমার বড় কাকার উক্তি। অথবা বাণী। আমার পরিবারে ব্রাজিল বাদে, ছোট কাকা জার্মানি। ফলে ২০০২ সালের ফাইনাল হল রক্ত গরম করা। অলিভার কানের বিচ্যুতি। ছোট কাকার মুখ ভার। রোনাল্ডোর গোল। আমার প্রথম বিশ্বজয়। ’৯৮-এর মন কেমনের রাত থেকে নতুন শতাব্দীর উত্তেজনার বিকেল। আমি বোধ হয় ব্রাজিলই থাকতাম, সাত গোলে হারার ক্ষত বিড়াল ছানার মতো বুকে আগলে রাখতাম, যদি না আমার জীবনে পলাশ মামা আসত। নীরবে পলাশ মামা অনেক দিনই ছিল আমার জীবনে। আমার বাড়ি বদলে গেল। বেলঘরিয়ায় চলে গেলাম। মামার বাড়ি, কলেজ, থিয়েটার, সদ্য প্রেম, প্রেম ভাঙা বেশ চলছিল। একদিন কালীতলায় পলাশ মামা বোঝাচ্ছিল কেন মারাদোনা, পেলে নয় কেন। কেন? মনে নেই। কেবল মনে আছে, আমার মনে হল তাই তো! আমি মারাদোনা, আমি আর্জেন্টিনা, আমি মেসি। আমি ধর্মচ্যুত হলাম। সরি বাবা! আমি তোমার পক্ষে থাকতে পারিনি। ফেডেরার পেরেছি, ইস্টবেঙ্গল পেরেছি, কেবল ব্রাজিলেই পা-টা ফস্কে গেল। 

উইম্বলডনের সেই ম্যারাথন ফাইনাল আমি আর বাবা দেখেছিলাম। ফেডেরার ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে নাদালের বিষাক্ত ফোরহ্যান্ডের সামনে। আশ্চর্য চাপের মুহূর্তে ফেডেরারের ক্রসকোর্ট সিঙ্গল হ্যান্ডেড ব্যাকহ্যান্ড। আহ! যেন রঙের বিস্ফোরণ ক্যানভাসে। সেকেন্ড সেট থেকে বাবা ঘনঘন শ্বাস ফেলছেন। সম্ভবত অনবদ্য ম্যাচ রিডিং অথবা কু-ডাক। আমি জানি বাবার অকারণ টেনশন, এই তো জিতে যাব। বাবা জানতেন সব ম্যাচ থেকে ফিরে আসা যায় না। এই মাসের ৮ তারিখ হসপিটালে বাবার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। আমি জানি অক্সিজেনের মাত্রা বাড়িয়ে দিলেই ঠিক হয়ে যাবে। বাবা জানতেন দৌড় কোথায় থেমে যায়। সময়টা ৯০ মিনিট।  তার বেশি চাইলেই কি আর পাওয়া যায়! আমার বাড়ি এখন ব্রাজিল শূন্য। বাবা এবং বড় কাকা কেউ নেই। এই মৃত গরম দেশে ভেসে আছে তাদের স্বপ্নেরা। ভেসে থাকো বাবা। মিডফিল্ড থেকে ভাসানো বল। আরও একটু লাফাও বাবা! মাথা ছুঁয়ে দাও বলে। গোল, উল্লাস। গঙ্গা পাড়ের মাঠ উদ্বেল হয়ে উঠুক। কেবল যত দিন মেসি আছে আরও একটা কাপ আমাদের হোক। তোমাদের তো পাঁচ খানা আছে। আমাদের কিছু নেই-এর জীবনে গপ্পো বলার মত তিনটে ওয়ার্ল্ড কাপ থাক। 

‘মেসি কাপ ধরবে!’ পলাশ মামা ২০১৪ সালের গোটা ওয়ার্ল্ড কাপ জুড়ে এই কথা বলে গিয়েছিল। এখনও চমকে উঠি সে কথায়। তথ্য এবং আবেগ পলাশ মামার দু’পকেটে ভরপুর। ফলে এর অন্যথা হয় না। নেদারল্যান্ডের সঙ্গে আমাদের সেমিফাইনাল হয়েই চলেছে শেষ আর হয় না। আমি সোফায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। মামা আর পলাশ মামা জেগে। ‘চিকু মেসি কাপ ধরবে ওঠ!’ ভাবলাম ঘুমের ঘোরেই বোধহয় ফাইনালটা পেরিয়ে গেল। হায়রে! না খেলা এখনও আছে। টাইব্রেকার পেরিয়ে ফাইনালে উঠলাম। উঠে আবার ঘুমিয়ে পরলাম। মনে রইল প্রেম প্রতিজ্ঞা, ফাইনালের রাতে ঘুমানো যাবে না। কারণ? প্রশ্নগুলি সহজ, আর উত্তরও তো.. মেসি কাপ ধরবে। এরই মাঝে ব্রাজিল খামোখা সাত গোল খেয়ে বসল। বাবা চুপচাপ। পলাশ মামা উত্তেজিত। আমি চিন্তিত। অবশেষে ফাইনাল এবং অষ্টমীর দিনের বৃষ্টির মত মারিও গোটজে! ওই ফর্সা বেঁটে ছেলে পলাশ মামাকে অবধি চুপ করিয়ে দিয়েছিল। তার চার বছর পর তপনে চন্দ্রগুপ্তের অভিনয় চলছে। ওদিকে ফ্রান্স আর্জেন্টিনা। ২০১৮-এর ওয়ার্ল্ড কাপ। মেসির জন্য আর একটু হলে মরতে ভুলে যাচ্ছিলাম। তপনের উপরে হাবুদার ঘরে রাজ পোশাকে খেলা দেখছি। আমি, মহারাজ নন্দ। হাবুদা উইংয়ে পাহারায়। শেষে হাবুদা আমায় টেনে নিয়ে এল। ‘ওরে তোর মরার সিন!’ সিন করে বেরিয়ে আসার মধ্যে আবার স্বপ্নভঙ্গ হয়ে গিয়েছে। মেসির ওয়ার্ল্ড কাপ জয় দূরাগত মাদলের শব্দ যেন। আছে কোথাও, তবু ধরা যায় না। 

তারপরও জীবনে এক একটা দিন আসে, যেদিন জীবনের গাল টিপে আদর করে দিতে ইচ্ছে হয়। সেদিন আমি একা খেলা দেখছি। আবার এক নতুন বাড়ি। সেখানে আমি একা। আমার ব্যক্তিগত দোদুল্যমান রাত। ২০২২। উড়ছি, ভাসছি। জয় কেবল সময়ের অপেক্ষা। দুম করে জুড়ে বসল এমবাপে৷ প্রায় কান্না এসে যায়। আমার আশ্রয় তখন এক একনিষ্ঠ ব্রাজিল ভক্ত। যে কখনও জার্সি বদলায়নি। ‘বাবা কি হবে?’ ঠান্ডা পাহাড়ি বিকেলের মত আশ্বাস ছিল বাবার গলায়, ‘চিন্তা করিস না, তোরাই জিতবি’। আমার একক অবস্থানের সেই প্রথম জয়। আমি জার্সি বদলেছি নিশ্চিত, তবে শিল্পের প্রতি ভালবাসা থেকে চ্যুত হইনি। যে কারণে ফেডেরার, সেই কারণেই মেসি। শসার মত ঠান্ডা মাথা, ইস্পাতকঠিন মন। যাঁরা কেবল খেলোয়াড় নয়, তার অতিরিক্ত কিছু। প্রতি চার বছর পর এ এক আশ্চর্য সময় আসে। নিজের দেশ ব্যতিরেকে অন্য দেশের জন্য চিৎকার, সমর্থন, চোখের জল। স্বপন জেঠুর কথা মনে পড়ে যে বলেছিল, “ভারত বিশ্বকাপ খেললেও আমি ব্রাজিল”। অন্য দেশের পতাকা গায়ে জড়িয়ে নিলেও কেউ অ্যান্টি-ন্যাশনাল বলে দাগিয়ে দেবে না এই  সময়। ব্যক্তিগত শোকের মধ্যেও মনে হয় জীবন আসলে রঙিন। চলমান। বেঁচে থাক আমাদের স্বপ্নেরা। আমাদের ধুমায়িত ক্লান্ত ফুসফুসে তাজা হাওয়া ভরে দিক আমাদের নায়কেরা। হে পাঠক, আপনার জার্সির রং ভিন্ন হলেও আপনার সঙ্গে আমার বৈরিতা নেই। কারণ আমি আপনি, আমরা আসলে স্বপ্নের সন্ধানী। ভামোস আর্জেন্টিনা। মেসির হ্যাটট্রিক হয়ে গিয়েছে। এবার আমাদের লক্ষ্য তিন। আর তিনটি ওয়ার্ল্ড কাপ হলেই  বাবা! নাহ থাক। বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।