প্রতীক্ষা ঘোষ

আন্তন চেকভের আঙ্কল ভানিয়া অবলম্বনে নির্মিত হলেও ‘বিদায়বরণ’ কোনও পুনর্নির্মাণ নয়; বরং আত্মস্থ করা এক নাট্যভাষা। ‘করুণাময়ী সপ্তর্ষি’ প্রযোজিত এই প্রযোজনাটি আমাদের চেনা সামাজিক বাস্তবতাকে কেন্দ্র করেই নিজের পরিচয় নির্মাণ করে। এখানে চেকভের থিম ছায়ার মতো উপস্থিত, কিন্তু নাটকটি কথা বলে এই সময়ের, এই সমাজের, এই মানুষের।

নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র ভাস্কর মামা। একসময় যাঁর মধ্যে লেখার ক্ষমতা ছিল, চিন্তা ছিল, স্বপ্ন ছিল। কিন্তু জীবনের দীর্ঘ পথে সেই স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে অন্যের দায়িত্ব বহন করতে করতেই ক্ষয়ে নিয়েছে। দিদির সংসার, ভাগ্নির ভবিষ্যৎ, জামাইবাবুর প্রতিষ্ঠা—এই সমস্তকিছুর ভার কাঁধে তুলে নিয়ে ভাস্কর নিজের জীবনকে অবহেলিত করে রেখেছেন। দিদির মৃত্যুর পর সেই দায়িত্ব আরও ভাস্কর একার ঘাড়ে এসে পড়ে। বহু বছর পরে জামাইবাবু অবসর নিয়ে ফিরে আসেন—কিন্তু সেই বাড়িতেই, যা আদতে ভাস্করের শ্রমে গড়ে উঠেছিল। এই ফিরে আসা ভাস্করকে গৃহহীন না করলেও গৌণ করে তোলে। মঞ্চে এই দীর্ঘদিনের জমে থাকা অভিমানকে সমুদ্রনীল সরকার অত্যন্ত সংযত অথচ গভীর অভিনয়ে তুলে ধরেছেন।

জামাইবাবু বা প্রফেসর চরিত্রটি সমাজে বহুল পরিচিত। শহুরে বুদ্ধিজীবী, নিজের অতীত গৌরব ও লেখালিখির জগতে আবদ্ধ এক মানুষ, যাঁকে ঘিরে এক অদৃশ্য তোয়াজ সংস্কৃতি তৈরি হয়ে ওঠে। নাটক ধীরে ধীরে প্রকাশ করে, এই বুদ্ধিবৃত্তিক অহংকার আসলে কতটা ফাঁপা। প্রফেসর নিজের আবেগে ব্যস্ত থেকেও অন্যের আবেগকে প্রয়োজনে ব্যবহার করতে দ্বিধা করেন না। এই চরিত্রটি গ্রামীণ বাস্তবতার বিপরীতে শহুরে একচোখামির প্রতীক হয়ে ওঠে।

প্রফেসরের নতুন স্ত্রী জাগরী নাটকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও আধুনিক চরিত্র। সারাক্ষণ মোবাইলে ব্যস্ত থাকা তাঁর নিছক অভ্যাস নয়, বরং আত্মরক্ষার কৌশল। এই ব্যস্ততার আড়ালে তিনি লুকিয়ে রাখেন দাম্পত্যের শীতলতা, প্রথম পক্ষের কন্যার সঙ্গে দূরত্ব এবং নিজের গভীর একাকীত্ব। ভাস্করের ডাক্তার বন্ধু অরণ্যের প্রেমপ্রস্তাব গ্রহণ করেও জাগরীর নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া নাটকে কোনও মেলোড্রামা সৃষ্টি করে না; বরং এক ক্লান্ত, বিভ্রান্ত নারীর মানসিক অবস্থাকে নিঃশব্দে প্রকাশ করে।

ভাগ্নি সুরভি চরিত্রটির মধ্য দিয়ে নাটক ভবিষ্যৎ প্রজন্মের এক অসহায় বাস্তবতাকে তুলে ধরে। পরিস্থিতির চাপে তার পড়াশোনা থেমে গেলেও বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা, সংসার গুছিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা তার মধ্যে প্রবল। অরণ্যের প্রকৃতি-প্রীতি তাকে আকর্ষণ করলেও ভালোবাসার প্রশ্নে সে অবহেলিত। এই অবহেলার মুহূর্তগুলোতে আলোক নির্দেশক সৈকত মান্নার আলোর ব্যবহার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—নীরব বিষণ্নতা মঞ্চে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

অমিত রায়ের মঞ্চসজ্জা নাটকের বক্তব্যকে গভীরতর করে। পাতাহীন বৃহৎ গাছটি যেন সম্ভাবনার মৃত্যু এবং বন্ধ্যা জীবনের প্রতীক। গাছের গোড়ায় থাকা ফায়ারপ্লেস আগুনের উপস্থিতি জানালেও উষ্ণতার অভাব চোখে পড়ে—যেমন নাটকের চরিত্রগুলোর জীবনে সম্পর্ক আছে, কিন্তু উষ্ণতা নেই। কাঠের চেয়ার ও ঝুলন্ত ফাঁকা বাক্সগুলো দৈনন্দিন একঘেয়েমি ও একাকীত্বের দৃশ্যমান রূপ।

শব্দ প্রয়োগে সামান্য কারিগরি ত্রুটি থাকলেও তা নাটকের সামগ্রিক অভিজ্ঞতাকে ক্ষুণ্ণ করে না। নির্বাচিত সঙ্গীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বিপ্রজিৎ ভট্টাচার্যের গান আবহকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।

পরিচালক সমুদ্রনীল সরকার ‘বিদায়বরণ’-এর মাধ্যমে বিদায়কে বরণ করার কথা বললেও, আসলে দর্শককে সতর্ক করেন—নিজের জীবন, নিজের স্বপ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন হলে শেষ পর্যন্ত অভিমান জন্মায় নিজের ওপরেই। এই নাটক দুঃখের কাঠগড়ায় দাঁড় করায় না; বরং আফসোসের মাঝখান দিয়েই ভাল থাকার সম্ভাবনার কথা বলে যায়। নিজের পাশে নিজে দাঁড়াতে পারলে একাকীত্বও একসময় উৎসবে পরিণত হতে পারে—এই মানবিক বোধই ‘বিদায়বরণ’-এর মূল শক্তি।