উদ্দালক
আসল গা-জ্বালা কিসে? মমতা ব্যানার্জি এতদিন ধরে ক্ষমতার অলিন্দে, সেই কারণে? নাকি একজন মহিলা মুখ্যমন্ত্রী পদে বসে আছেন, এই কারণে? সম্প্রতি সিপিএম-এর নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের এক মন্তব্যে এই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
এই প্রশ্ন স্বাভাবিক। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় বারংবার মমতা ব্যানার্জিকে তাঁর নারী পরিচয় নিয়ে আক্রমণ করেছেন সিপিএম-এর নেতারা। অনিল বসুর সেই কুখ্যাত ভাষণের ক্লিপিং এখনও সোশ্যাল মিডিয়ায় খুঁজলেই পাওয়া যায়। তাঁরই উত্তরাধিকার বহন করছেন বিকাশ ভট্টাচার্যরা। যাঁরা ফেসবুকে লিখতে পারেন, 'রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ভিনরাজ্যেরর পুলিশ কে প্রকাশ্যে কাপড় দেখিয়ে বলছে, দেখুন ঘরের কাপড় পরে এসেছি। এর থেকে বড়ো বেহায়াপনা আর কি হতে পারে? বাংলার মেয়েরা এত নির্লজ্জ ও বেহায়া নয়।' এমন করে বিকাশ কথাটা লিখলেন, যেন তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন বাংলার মেয়েদের। কথাটা শুনে একজন রাজনীতির ছাত্র হিসাবে মনে হচ্ছে, বামপন্থার প্রাথমিক শিক্ষাও সম্পূর্ণ হয়নি বিকাশবাবুর। সেই কারণেই একজন সহ-নাগরিকের উদ্দেশ্যে, তাঁর লিঙ্গপরিচয় নিয়ে কী ধরণের উক্তি করলে সেটা কটুক্তি বলে গণ্য হতে পারে, সেই বোধ তৈরি হয়নি। বা হতে পারে সেই বোধ তাঁর ছিল, অধুনা বিলুপ্ত হয়েছে, দীর্ঘদিন ক্ষমতা হাতে না পেয়ে!
বাম শাসনে তিনটি রাজ্যের রাজ্য সরকার চলেছে দীর্ঘদিন। কোনও রাজ্যে একবারের জন্যও কোনও মহিলা মুখ্যমন্ত্রী পদে বসেননি। পার্টি ভাগ হওয়ার পর থেকে একজন মহিলা পার্টির সাধারণ সম্পাদক পদে বসতে পারেননি। ১৯৬৪ সালের সুন্দারাইয়া থেকে নাম্বুদ্রিপাদ, প্রকাশ কারাত, ইয়েচুরি হয়ে এম এ বেবি পর্যন্ত, একজন মহিলাকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি সাধারণ সম্পাদক পদে বসানোর মতো। তেমনই মুখ্যমন্ত্রীদের তালিকাও। তেমনই মানিক সরকার, জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, পিনারাই বিজয়ন বা অচ্যুতানন্দন, সকলেই পুরুষ। মহিলাদের ক্ষমতার শীর্ষে তাহলে কি একটু দূরেই রাখতে চেয়েছে সিপিএম, সেই প্রশ্ন উঠতে বাধ্য।
এবার তাকানো যেতে পারে পলিটব্যুরোর দিকে। পলিটব্যুরোয় ১৬ জন সদস্য আছেন বর্তমানে, সেখানে মাত্র দু'জন মহিলা সদস্য। গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট ইউ বাসুকী আর সম্পাদক মারিয়াম ধাওয়ালে। আনুপাতিক হিসাব নিতান্তই নগন্য। কেন! মনে হয়, মহিলাদের ক্ষমতার অন্দরে স্থান দিতে চায় না সিপিএম।
বঙ্গের রাজনীতিতে মমতার বিরুদ্ধে যেটুকু লড়াই করছে সিপিএম, যে মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে লড়ছে বামপন্থী দল, সেখানে আছেন মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়, দীপ্সিতা ধরদের মতো মহিলাদের নাম। যাঁরা ছাত্র রাজনীতির মানচিত্র থেকে রাজ্য রাজনীতির মানচিত্রে উঠে এসেছেন, মাঠে-ঘাটে যাচ্ছেন, লড়াই করছেন। বিকাশ বাবুদের মতো কমরেডরা সেই লড়াইয়ে জল ঢেলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আসলে বিকাশবাবুরা ভেবেছেন, মামলা করে সরকার বদলাবেন। ওই, এখানেও আসে রাজনৈতিক পরিণতি ও বামপন্থার প্রাথমিক শিক্ষার ও প্রশিক্ষণের প্রসঙ্গ। বিকাশবাবুদের সেটুকুও নেই। কারণে, মাঠে-ময়দানে লড়াইয়ের মুখগুলোকে প্রশ্নও বিপদের মধ্যে ঠেলে দিয়ে ঠাণ্ডা ঘরে বসে মজা দেখতেই তাঁরা বেশি ভালবাসেন। মমতা ব্যানার্জিকে কুরুচিকর আক্রমণ করেও তাই তাঁর বিশেষ বোধ কাজ করে না যে এতে দলের লড়াকু মহিলা কর্মীদের কী সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে।

আসলে বামপন্থী দলগুলির মধ্যে, বিশেষত সিপিএমের মধ্যে দীর্ঘদিন ক্ষমতার অলিন্দে থাকার কারণে একটা জমিদারি ভাব আছেই। যাঁরা এই ক্ষমতার অলিন্দে ছিলেন, তাঁরা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার এক-যুগ পরেও সেই জমিদারির গন্ধ গা থেকে মুছতে পারেনননি। বিমান বসুর মতো ব্যতিক্রমী কয়েকজন ছাড়া সকলেই সারাক্ষণ ভেবে চলেছেন, কী করে ভোটবাক্স কোনওরকমে ম্যানেজ করে ক্ষমতা দখল করে সুখ ভোগ করা যায়। আর সেই উদ্দ্যেশ্যে বারংবার ব্যর্থ হওয়ার ফলে জমা হচ্ছে ফ্রাস্ট্রেশন। সেখান থেকে উঠে আসছে আলটপকা মন্তব্য। যে মন্তব্যের দিলীপ ঘোষ আর বিকাশ ভট্টাচার্য্যের ফারাক মাঝে মাঝে ঘুচে যাচ্ছে।
১৯২৫ সালে যশোরে জন্মেছিলেন ইলা মিত্র। এই বছরই তাঁর শতবর্ষ পালিত হচ্ছে। সেই উপলক্ষে একটি লেখায় গবেষক শর্মিষ্ঠা দত্তগুপ্ত লিখছেন, ‘এর পাশাপাশি জনমানসে হারিয়ে যায় বহু নাম, যে নামগুলো শুধুমাত্র কিছু পরিবারের স্মৃতিতে, কিছু গ্রামের জীর্ণ স্মারকস্তম্ভে এবং কিছু বামপন্থী দলিল-দস্তাবেজে বেঁচে আছে। পুলিশের গুলিতে গর্ভবতী অবস্থায় মৃত্যু হওয়া দিনাজপুরের কৌশল্যা কামরানী, চন্দনপিড়ির অহল্যা দাস, হাওড়ার সুধাময়ী সাঁতরার নাম মুছে গেছে। বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে তেভাগায় নিহত যশোদারানী সরকার, সুনিমা সিং, ফকো বর্মণী, সরোজিনী দাস, উত্তমী দাস, বাতাসী সিংহ, করমী ওরাওঁনি, বুধনী ওরাওঁনি, সুরধনী বাজ, বৃন্দা বাউরি, পাঁচুবালা ভৌমিক, মুক্তকেশী মাঝির মতো আরও কত নাম’। কারণ, পুরুষ প্রভাবিত বামদলগুলি এদের কথা বারংবার বলা থেকে বিরত থেকেছে।
মহিলা নেতৃত্বে এদের বোধহয় অসুবিধা আছে। আর সেই বিদ্বেষ থেকেই একজন মহিলার কাপড় নিয়ে এমন মন্তব্য করা যায়, তিনি মুখ্যমন্ত্রী হলেও করা যায়। করতে থাকুন, বিকাশ বাবুরা মামলা করতে থাকুন, টেলিভিশনে মুখে দেখাতে থাকুন, আরও আরজনৈতিক, কুরুচিকর আক্রমণ করতে থাকুন, গ্রাম-গঞ্জে লড়াই যাঁরা করার, তাঁরা এসবের ধার না ধারবেন না কোনওদিন, লড়াই করে যাবেন। শুধু বিকাশবাবুদের ইতিহাস উপেক্ষা করবে ও মনে রাখবে বাম আন্দোলনের ক্ষতিকর উপাদান হিসেবে।
