উদ্দালক: পশ্চিমবঙ্গে যে তারা জিততে পারবে না, তা কি এখন থেকেই আন্দাজ করে নিয়েছে বিজেপি? এবারের কেন্দ্রীয় বাজেটের পর সে কথা যেন আরও স্পষ্ট হচ্ছে। বিহারে ক্ষমতা দখলে উদগ্র বিজেপি কেন্দ্রীয় বাজেটে স্পেশাল প্যাকেজ রেখেছিল সে রাজ্যের জন্য, কিন্তু তাঁর সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র এই রাজ্যের ক্ষেত্রে। ফ্রেট করিডর, শিল্পতালুক ছাড়া আর তেমন কিছুই নেই। সরাসরি সাধারণ মানুষের উপকার হবে, এমন কোনও প্রকল্প, একশো দিনের কাজের টাকা বা কেন্দ্রীয় কোনও প্রকল্পের বরাদ্দ বৃদ্ধি, কিছুই নেই বাজেটে। মানে, আলাদা করে ভোটের জন্য পশ্চিমবঙ্গকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা ভাবেননি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী। 

ভোটের মুখে যে সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ভাবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বটে। প্রধানমন্ত্রী বাজেটকে ঐতিহাসিক বললেও এ রাজ্যের শাসকদলের হাতে বঞ্চনার ইস্যু যে ব্রহ্মাস্ত্র হয়ে ফিরে এল, সেটাই পরিষ্কার হল দিন শেষে। বাজেটের পরেই তাই সমালোচনা করতে ছাড়েননি মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বা অভিষেক ব্যানার্জিরা। মমতা বলেছেন, 'এই বাজেট বিপথগামী, ভিশনলেস, মিশনলেস, অ্যাকশনলেস। অ্যান্টি উইমেন, অ্যান্টি পুওর, অ্যান্টি ফার্মার, অ্যান্টি ইউথ, অ্যান্টি এসসি, ওবিসি।' শুধু তাই নয়, একাধিক বিষয় তুলে ধরে মমতা বললেন, 'এই বাজেট সম্পূর্ণরূপে গারবেজ অফ লাই (মিথ্যার জঞ্জাল)।' শেয়ার বাজার, সেনসেক্স, নিফটি ফিফটি'র প্রসঙ্গও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। 

তারপরেই আসে বাংলা বঞ্চনার প্রসঙ্গ। তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী প্রশ্ন করেন, 'বাংলার জন্য কী দিয়েছে? কিছুই না। বড় বড় কথা বলে। কিছু দেয়নি।' ২০০৯ সালে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী থাকার সময় এই পণ্য করিডর তৈরি করার ঘোষণা করেছিলেন তিনি, সেই কথাও এদিন উল্লেখ করেন মমতা। সঙ্গেই মমতা মনে করিয়ে দেন, তাঁর সরকার গত বাজেটেই রাজ্যে  ছ’টি পণ্য করিডর তৈরির কথা ঘোষণা করেছে। মমতা বললেন, এই বাজেট 'মিথ্যে কথার ফুলঝুরি।' মমতা এদিন বলেন, 'ওরা জানে, ওরা বাংলায় হারবে, সেই কারণেই এসআইআর করেছে।'

মমতা ব্যানার্জির শেষ কথাটাই গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতিক ,স্কুলের ছাত্ররা এখান থেকেই নির্বাচনের ন্যারেটিভ তৈরির একটা চেষ্টা করতে পারেন। শেষ একবছর ধরে নানা কারণে বিজেপির মুখ পুড়েছে। সাংগঠনিক স্তরে গেরুয়া শিবিরের অবস্থা রাজ্যে ভাল নয়। এসআইআর-এর হিড়িক তুলে রাজ্যের বিরোধী দল ভেবেছিল ফায়দা লুটবে, কিন্তু তাও বুমেরাং হয়েছে। লোকে ক্ষেপে গিয়েছে অযথা হয়রানিতে। যে কাজ দু'বছরের, প্রযুক্তির সাহায্যে সে কাজ দু'মাসে করতে গিয়ে ল্যাজেগোবরে হয়েছে নির্বাচন কমিশন। আর সেই ক্ষোভকে সামনে রেখেই আগ্রাসী লড়াইয়ে নেমেছে তৃণমূল। 

সাধারণ মানুষকে জনে-জনে সাহায্য করা থেকে শুরু করে বারবার নির্বাচন কমিশনকে চিঠি লেখা, প্রতিবাদ সভা করা, এমনকী মমতা ব্যানার্জির দিল্লিতে চলে যাওয়ার মতো ঘটনা তৃণমূলকে সাধারণ মানুষের আরও কাছাকাছি এনেছে। যারা ভেবেছিল, ভোট বাক্সে সুবিধা হবে, সেই বিজেপি উল্টে এই প্রক্রিয়ায় আরও ক্ষোভের মুখে পড়েছে মানুষের। যে মতুয়া ভোট বিজেপিকে মাথায় করে রেখেছিল, তারাও উল্টো গাইতে শুরু করেছে। সব মিলিয়ে বেশ কিছুটা ব্যকফুটেই ছিল এ রাজ্যের গেরুয়া শিবির। স্বাভাবিকভাবে, বাজেটের দিকে তাকিয়ে ছিলেন রাজ্যের বিজেপি সমর্থকরা। যদি ঝুলিতে কিছু জোটে, মানুষের কাছে গিয়ে বলার মতো তো অন্তত কিছু থাকবে। 

কিন্তু নির্মলার ভাষণের পর সে গুড়ে বালি পড়েছে। বিজেপির স্থানীয় পার্টি অফিসে এখন আলোচনা চলছে, সাধারণ গরিব মানুষকে তাঁরা বলবেন কী! সাধারণ গরিব মানুষ না বোঝে ফ্রেট করিডর, না বোঝে শিল্প তালুক। মানুষ বোঝে রোজের খরচ কমল কী না, নতুন ট্রেন পেলাম কী না, গ্যাসের দাম কমল কী না। ফলে বাজেট থেকে ভোটের প্রচারের ইস্যু পাওয়া হল না বিজেপির। 

এবার তা হলে মূল আলোচনায় আবার ফিরে আসা যাক। বিজেপি কি সত্যিই চাইছে না এ রাজ্যের ক্ষমতা দখল করতে? চাইবেই বা কী করে, এ রাজ্যের নেতৃত্বের তো তথৈবচ অবস্থা। যে হিন্দু-মুসলমান বিভাজনের রাজনীতি উত্তর ভারতের সর্বত্র চলে, এ রাজ্যে সেই তাস কোনওভাবেই কাজে আসছে না। কিন্তু শুভেন্দুর মতো অপরিণত রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই একটাই ন্যারেটিভ ধরে বসে আছে। দূর্নীতির ইস্যুতেও একের পর এক তৃণমূলের নেতারা ছাড়াও পেয়ে গিয়েছেন। তাই শুধু তৃণমূলের বিরোধিতা করে আর হিন্দু-মুসলমান বিভাজন করে এ রাজ্যে ভোটে যেতা যাবে না, সে কথা অপরিণত মাথাও বুঝতে পারবে। শুধু বোঝেন না বাংলার গেরুয়া শিবিরের নেতারা, মূলত শুভেন্দু অধিকারী।

আসলে মানুষ ভোট তখনই দেবেন, যখন বিরোধিতার বাইরেও নতুন কোনও দিশা দেখাতে পারবে কোনও দল। শুধু আক্রমণ আর বিরোধিতা করে ভোটে জেতা যায় না। ফলে ভোটের মুখে প্রায় ময়দান ছেড়েই বসে আছে বিজেপি। মনে হয় এই গা-ছাড়া ভাব আরও বাংলার বিজেপি নেতৃত্বের কাজকর্ম দেখেও এসেছে। ভাবটা এমন, ‘কী হবে আর এদের জন্য করে, ভোটে জেতার ক্ষমতা তো এদের নেই।’ সেই কারণেই বাজেটে অকারণ হারা ম্যাচ জিততে রাজকোষ খালি করতে চায়নি কেন্দ্রীয় সরকার। তবে এখন দেখার, এই বাজেট নিয়ে আদৌ বিজেপি বাংলায় কোনও প্রচার করে নাকি, সেই মন্দির আর মসজিদের রাজনীতিতেই আটকে থাকে।