উদ্দালক
শিল্পে কার কথা বলতে হয়! পরাজিতের কথা, নাকি জয়ীর কথা? পরাজয় বা জয় কি সার্বিক নাকি দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়? কাকে পরাজিত বলে। কে, কেন, কীভাবে হারে বা জেতে? ইতিহাস ঘাঁটলে এমন প্রশ্নের নানারকম উত্তর পাওয়া যাবে। কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারবেন না কে পরাজিত। আসলে প্রত্যেকটা পরাজয়ের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকে একটা জয়ের আলো। গয়েশপুর সংলাপ প্রযোজিত 'তাজমহল' সেই পরাজিত নায়কের জয়ের ব্যালাড রচনা করে। উদযাপিত নাট্যকার হর ভট্টাচার্য লিখিত, সুদীপ্ত দত্ত নির্দেশিত এই নাটক সেই কারণেই এক অন্য আবহ রচনা করে মঞ্চে।
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় শাহাজাদা দারাশুকোর একেবারে শেষে লিখছেন, 'শাহজাদা দারা ফের তাঁর তাঁবুর বাইরে এলেন। সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি বুঝলেন, এই যে লোক-লশকর, এত যে মানুষজন তন্খা পেয়ে ঘোরাঘুরি করছে-এদের কেউই লড়াইয়ের পরিণাম নিয়ে ভাবছে না। সে দায়িত্ব তাঁদের নেই। জয় হলে হিন্দুস্থানের জয়। মুঘল শাহীর জয়। হার হলে স্রেফ শাহজাদার হার। মহম্মদ দারাশুকোর হার। হেরে ফেরার পথেও বাকি সবাই তনখার দাম, আশরফি বুঝে নেবে। গুণে নেবে। আমি একা মুখ কালো করে ফিরব।
ওঃ! কান্দাহার, কান্দাহার! তুমি তোমার কোন মুখ দেখাবে? সে মুখ জয়ের? না হারের?
শাহজাদা দেখলেন, পুবের পাহাড় টপকে সূর্য তার জায়গায় এসে দাঁড়াচ্ছে। এবার সারা দুনিয়া ঝাঁ-ঝাঁ করে জ্বলতে থাকে'।
তপন থিয়েটার জুড়ে এই নাটকের অভিনয়ের সময় তেমনই আশ্চর্য এক আভা ঘুরে বেড়াল হয়ত এই কারণেই। কারণ, তিনি হেরে যাওয়া হলেও কোথাও যেন জিতে যাওয়া। যেখানে এখন বারংবার ধর্মের নামে ভেদাভেদ, মারমারি আর স্বৈরাচারের আগুন জলে উঠছে দেশে-দেশে, সেখানে দাঁড়িয়ে দারার মতো মানুষ চেয়েছিলেন আকাশ রচনা করতে, যে আলোয় সমান আলোকিত হবে দেশ। কিন্তু শাসকের ইতিহাস যে বড় নির্মম। দারাশুকোর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন পরিচালক সুদীপ্ত নিজে। তাঁর পরিচালনায় যে ছিমছাম, নিয়ন্ত্রিত ভাব আছে, তাঁর অভিনয়েও সেই সুর আছে বিদ্যমান। তিনি নেতৃত্বের ভাব নির্দেশনায় ও অভিনয়ে সমান তালে ধরে রেখেছেন। বারংবার যে ক্ষতবিক্ষত অন্দরকে ছুঁতে চেয়েছেন তিনি, তা তাঁর অভিনয়ে ধরা দিয়েছে। বিদ্যুতের ঝলকের মতো মাঝে-মাঝে সমস্তকে অতিক্রমও করে গিয়েছে। আর সেই জন্যই তাঁকে আলাদা করে ধন্যবাদ প্রাপ্য।
বেশ কয়েকটি চরিত্রের অভিনেতাদের নাম আলাদা করে উল্লেখ করতে হয়। শাহজাহানের ভূমিকায় পঙ্কজ সিংহ রায়, জাহানারা চরিত্রে অর্পিতা দত্ত, ঔরঙ্গজেবের ভূমিকায় সমরেশ সাহা, রোশনারার ভূমিকায় রূপকথা দত্ত, জেবউন্নিসার ভূমিকায় মিশি রায় চৌধুরী। আলাদা করে এই নাটকে তৈরি করা হয়েছিল কিছু স্টাইলাইজ অভিনয়ের ধারা। সেখানেও হাকিম জাউদ, কাজী বা পেশকারের ভূমিকায় অভিনেতারা যথাক্রমে শুভাশীষ দাস, রাজা সাহা, প্রণব সাহারা অত্যন্ত সপ্রতিভ ও নির্দিষ্ঠ। কোথাও তাঁদের অভিনয় মাত্রা অতিক্রম করেনি, যাতে একে ভাঁড়ামো মনে হয়।

মঞ্চ ভাবনায় অত্যন্ত দক্ষতার ছাপ রেখেছেন পরিচালক সুদীপ্ত। মোঘল আমল বা ঐতিহাসিক নাটকের মঞ্চ নির্মাণের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক অতীতে প্যান্ডেল মার্কা সেটের উদাহরণ একাধিক ক্ষেত্রে দেখেছি। কিন্তু এক্ষেত্রে সেসবদের দিকে যাননি পরিচালক। বরং তিনি চেয়েছেন, এমন একটা মঞ্চ তৈরি করতে যাতে সেট নাটকের মূল বিষয়বস্তুকে পূর্ণ করে। সেই বৃত্ত পূর্ণ করার কাজে সুদীপ্ত সফল। এই নাটকে রূপসজ্জা ও পোষাকের কাজ ছিল চ্যালেঞ্জিং। একেবারে দক্ষিণবঙ্গের বাঙালিকে মোঘল আমলের রাজা বাদশার চেহারা দেওয়া কঠিন কাজ। সেদিক থেকে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন রূপসজ্জা শিল্পী অলোক দেবনাথ ও পোষাক পরিকল্পক সঞ্জীব মজুমদার। মনোজ প্রসাদের আলোকভাবনা বারংবার মায়া তৈরি করেছে মঞ্চে। চরিত্রের মনস্তাত্তিক লড়াইকে ছুঁয়েছে আলো। আবহ ও নৃত্যের এক আশ্চর্য সঙ্গমও তৈরি হয়েছে এই নাটকে। মুসলমানি আমলের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির কথা আজও বইয়ের পাতায় ঝলমল করছে। সেই সময়ের সঙ্গীতের ধারার কথা সকলেরই জানা। কিন্তু এমন একটি নাটকের অন্দরে-বাহিরে সেকালের সঙ্গীতের যথাযথ ব্যবহার, যা নাটককে অকারণ ভারাক্রান্ত করবে না, কঠিন ছিল। সেই কাজও সুচারু ভাবে সম্পন্ন করেছেন পরিচালক, তার সঙ্গে সুরজিৎ নন্দীর আবহ যোগ্য সঙ্গত দিয়েছে। আর সেই বিচারেই বলা চলে, নৃত্য পরিকল্পক পারমিতা সিংহ রায় ও পঙ্কজ সিংহ রায় সফল।
সেই নাটকই সফল, যে নাটক প্রশ্ন করতে সেখায়। যে নাটক মাথার মধ্যে খুঁচিয়ে দেয় একাধিক প্রশ্ন। ভাবতে শেখায়, ভাবতে বাধ্য করে বলা চলে। বাংলা নাটকে যেখানে বারংবার উঠে আসে ডিজাইন আর চাকচিক্যের প্রাচুর্য, সেখানে একেবারে অন্যপ্রান্তে দাঁড়িয়ে সুদীপ্ত সাধনা করে চলেছেন বিষয়ের। সেখানে তিনি একমনে লড়ছেন হয়ত। কিন্তু তিনি এক নন। কেউ-কেউ আছে এখনও, অনেকেই আছে। যাঁরা সুদীপ্তর মতো চাইছেন, বাংলা নাটক শান্ত বিকেলে ফিরুক কবিতার মতো এমনই সব প্রযোজনার কাছে।
