উদ্দালক

১৯৯১ সালের ২১ মে প্রথমবারের জন্য মঞ্চায়িত হয় দায়বদ্ধ। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছোটগল্পকার, সাহিত্যিক জগদীশ গুপ্তের গল্প অবলম্বনে এই নাটক লিখেছিলেন নাট্যকার চন্দন সেন। সায়কের নাট্যপত্রে যে তথ্য রয়েছে,তাতে দেখা যাচ্ছে, এই নাটকের অভিনয় হয়েছিল মোট সাড়ে শাতশো। বাংলা গ্রুপ থিয়েটারের ইতিহাসে এই নাটক এক মাইল ফলক হয়ে আছে। আর সেই নাটকই মঞ্চে ফিরিয়ে আনল বাংলা অপেরা। তার ৫০তম অভিনয় সম্প্রতি হয়ে গেল কলেজ স্ট্রিটের ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে। এই নাটক দেখতে-দেখতে আবারও মনে হল, আসলে বাংলার নাটককে বারবার ফিরে যেতে হবে বিষয়ের কাছে, গল্পের কাছে। ডিজাইনের আয়োজন পড়ে থাকবে ধুলোয়, যদি গল্প থাকে। যে হাজার-হাজার বছর ধরে শব্দে, সুরে, ভঙ্গিমায় গল্প বলার রীতিতে মজে থেকেছে গোটা দেশ, সেই রীতিকে উড়িয়ে দিয়ে টিকে থাকবে না কিছুই। তাই এককালে সাড়ে সাতশো রজনী হওয়ার পরেও দিনের পর দিন নতুন করে এই নাটক অভিনয় হয়ে চলে, একইভাবে নজর কাড়ে ও দর্শকের মন টানে।

আসুন, এবার বসি মঞ্চের সামনে। আমি ব্যক্তিগতভাবে লেখক চন্দন সেনের ভক্ত। ২০০৬ সালে দিলদার নাটক দেখেছিলাম, তাঁর লেখা, সায়কের প্রযোজনা। সেখানে ছিল এক বিখ্যাত সংলাপ, 'গাছের গায়ে হাত দিলে সেও বোঝে এটা মালির হাত, না ফুলচোরের হাত।' তেমনই নাটকের সামনে বসে থাকা দর্শক বোঝেন, কোনটা নাটক আর কোনটা শো-অফ। দায়বদ্ধ এমন এক নাটক, যার সামনে বসতে ইচ্ছা করে, মনে হয়, এখানেই শেষ না হলে হত, মনে হয় আরও যদি কিছুটা চলত, তা হলে মন্দ হত না। লেখক চন্দন সেনের কথা তাই প্রথমেই লিখতে হয়। তিনি, তাঁর দৃষ্টি নিয়ে জাগ্রত থেকেছেন সান্ধ্যকালীন হলের প্রতিটি কোণায়। আজীবন থেকে যাবেনও। 

বাংলা অপেরার এই প্রযোজনায় পরিচালনার দায়িত্ব সামলেছেন অরিত্র ব্যনার্জি। সহ-নির্দেশক ঋক দেব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করার পাশাপাশি সহ-নির্দেশনার দায়িত্ব সামলেছেন। তাঁরা যে নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করেছেন প্রযোজনা জুড়ে, তা অনন্য। তাঁরা জানতেন, এই নাটকের মেরুদণ্ড নির্মাণ করেছেন চন্দন সেন, তাই কোথাও তাঁরা অতিক্রম করেননি। নিয়ন্ত্রিত আলোর ব্যবহার, মঞ্চের স্বাভাবিক কয়েকটি তল জুড়ে অভিনেতাদের যাতায়াতের স্বাধীন যাত্রাপথ, আলোর নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার দর্শককে টেনে রেখেছে কথাগুলোর দিকে। যে কথাগুলো আসলে গল্পকে নিয়ে এসেছে আমার-আপনার পাড়ায়, ঘরের জানলা দিয়ে উঁকি দিলেই যেন এমন এক গল্প দেখা যাবে। যেন এই গল্প ঘুরে বেড়াচ্ছে উঠোনের তুলসিতলায়, সন্ধ্যাবেলার ঠাকুরঘরে, বিকেলের পড়ে আসা রোদের মাঠে। সেই বিষয়টাকে সামান্যতম আঘাত করেনি নির্দেশকের নির্দেশনামা। 

পার্থ ভৌমিক ক্রমে নিজেকে পরিণত করছেন। তাঁর পরিশ্রম স্পষ্ট। তিনি সেই অভিনেতার পরিশ্রমেই উঠে এসেছেন বাংলার প্রথম সারির থিয়েটারের অভিনেতাদের তালিকায়। যে গগণ চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন, একদা সেই চরিত্রে অভিনয় করতেন খোদ মেঘনাদ ভট্টাচার্য। বাংলা থিয়েটারের প্রবাদপ্রতিম মানুষটির জুতোয় পা গলিয়েছেন পার্থ, তাই চাপ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি পেরেছেন। শুধু পারেননি, স্টার মার্কস নিয়ে পাশ করেছেন। দেবলীনা সিংহ, গৌতম চক্রবর্তী, ঋক দেব-দের কথা আলাদা করে বলতে হয় হয়ত, কিন্তু সমস্ত বেড়া অতিক্রম করে গিয়েছেন দেবযানী সিংহ। আশ্চর্য দক্ষ অভিনেত্রী তিনি। বহুদিন আগে অদ্য শেষ রজনী নামে একটি নাটকের এমনই এক গৃহবধুর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অঙ্কিত মাঝি, তিনিও প্রতিভাবান অভিনেত্রী। কিন্তু আজীবনের গ্লানি, লড়াই ও প্রেম ও বিরহকে জরায়ুতে ধারণ করে দেবযানী যে অভিনয় মঞ্চে করলেন, তা দেখে স্তম্ভিত হতে হয়। কখনও-কখনও মনে পড়ে ৮০-৯০-এর দশকের নিম্ন মধ্যবিত্ত বাঙালি বাড়ির অসহায় অথচ আত্ম শ্লাঘায় পূর্ণ নারীমুর্তির কথা। প্রত্নপ্রতিমার অনাবিল অনুশীলন বাংলা সংস্কৃতিকে চাবুকের মতো প্রয়োগ করেছিলেন ঋত্বিক ঘটক। সুবর্ণরেখায় সীতা শ্রেষ্ঠাংশে অভিনয় করেছিলেন মাধবী মুখ্যোপাধ্যায়। সম্ভবত সীতা ও সতীত্বের আর্কেটাইপের এক সাবভার্সান তৈরি করার তাগিদেই চরিত্রের নাম এমন রেখেছিলেন ঋত্বিক। সেই কারণেই ডাক্তার স্বামীকে ছেড়ে লরি ড্রাইভারের সঙ্গে মেয়ের হাত ধরে বেরিয়ে আসা মেয়েটির নামও সীতা। আসলে এখানেও চুরমার করা হচ্ছে প্রচলিত ধারণাকে, আক্রমণ করা হচ্ছে, মেয়েদের বেঁচে থাকার শর্তকে নতুন সমীকরণে ভাবা হচ্ছে। সেই কারণে এই চরিত্র এতটা অস্বাভাবিক রকমের গুরুত্বপূর্ণ। নাটকটি দেখতে-দেখতে মনে হয়, এই নাটকের নায়ক দ্বন্দ্বে পূর্ণ গগণ নয়, আসলে সীতাই এই নাটকের কেন্দ্র। কারণ, তাঁর লড়াই ও চরিত্রের বহুমুখিতা নাটককে ধরে রাখে, তাঁর কথাতেই নাটক চলে, এগোয়-পিছোয়, সিদ্ধান্তে যায়, গল্পের মোড় ঘুরে যায় তাঁর কথাতেই। দেবযানী সেই কাজ সেরেছেন একেবারে বিরাট কোহলির মতো। তিনি আগলে রেখেছেন পার্থর নাছোড় অভিনয়কে। পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনয় করেছেন নিরঞ্জন চরিত্রে। এমন মানুষ,মানে এমন মাস্টারমশাইদের এখন তেমন দেখা যায় না। আগেকার কলোনিতে এমন একজন করে মাস্টারমশাই থাকতেন। যাঁর জীবনের ঝড়ঝাপটা সামলেও তিনি লড়াই করেছেন নিজের আদর্শের জন্য। দ্বন্দ্বে ভুগেছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়িয়েছেন সত্যের কাছে, সত্যের মাঝামাঝি। পার্থ সেই চিত্র ফুটিয়েছেন অনন্য দক্ষতায়। 

নাটকের মঞ্চ নির্মাণ করেছেন দেবাশিস। তিনি এই কাজে বিশেষজ্ঞ। কীভাবে মঞ্চের তল নির্মাণ করতে হয়, কীভাবে মঞ্চের একাধিক তল নির্মিত হয় ও সেটাকে কীভাবে অভিনয়ে কাজে ব্যবহার করা যায়, সে জিনিস তাঁর কাছে জলভাত। এই নাটকেও তিনি তাই অনন্য কৌশলে কেবল কয়েকটি ফ্রেম ব্যবহার করে একটা গোটা বাড়ি তৈরি করে ফেলেছেন। মাঝের উঠোন আর দু-পাশের দু'টি ঘর, মাঝের কুয়ো ও মেয়ে ঝিনুকের পড়ার ঘর, কোথাও ভ্রম হয়নি বুঝতে। নাটকের আলোক পরিকল্পণা করেছেন সাধন পাড়ুই। তিনি যেভাবে কয়েকটি অপ্রথাগত সোর্স বা আলোক উৎস ব্যবহার করেছেন নাটকে, যাতে চমক লাগে। বিশেষত কুয়োর তলায়, সেলাই মেশিনের ভিতরে যেভাবে আলো ব্যবহার করেন তিনি, সেটা চমকপ্রদ ও অর্থবহ। নাটকে গানও গেয়েছেন পার্থ। কয়েকটি গান রেকর্ডেড, একটি মঞ্চেই তাঁকে গাইতে শুনতে পাবেন দর্শকরা। 

দায়বদ্ধ দেখতে দেখতে যে কথাটা আগে মনে হচ্ছিল, সেটা প্রথমেই লিখেছি। কিন্তু সেটা আরও একটু লিখতে চাইছি। আমাদের ফিরতে হবে গল্পের কাছে। সেই গল্প বা কমিউনিকেশন যে সবসময় সংলাপে হবে তা নয়, ভঙ্গিতেও হতে পারে। কিন্তু গল্পের ভিত্তিটা জোরদার হওয়া জরুরি। কেন জরুরি জানেন তো, বাঙালির কাছে মগজের প্রতিটি সুপ্ত স্মৃতিতে এখনও জড়িয়ে আছে কোন-কালে দাওয়ায় বসা মা-ঠাকুমার বলা গল্প কথা। সে সব দিন হয়ত মিলিয়ে গিয়েছে, কিন্তু এই পরিবার সংকটের যুগেও সেই অতীত মানুষকে কাঁদায়, হাসায়। তাই আজও, এই মোবাইল রিল আর সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সন্ধ্যাতারা হয়ে জেগে থাকে দায়বদ্ধ।