সঞ্জীব দাস 

বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি কথাশিল্পী শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় (১৯০১—১৯৭৬)। বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর হাত ধরেই রানিগঞ্জ-আসানসোল-অন্ডালের কয়লাখনির সাঁওতাল-বাউরি  কুলি-কামিনেরা  বাংলা সাহিত্যের পরিসরে প্রথম স্থান পায়। আজকের পরিভাষায় যাকে ‘সাবঅলটার্ন সাহিত্য’ বলে, বাংলা সাহিত্যে  তিনিই তার প্রকৃত পথিকৃৎ।

পূর্বতন সুধী সমালোচকেরা, এমনকি  কোনও কোনও স্বনামধন্য লেখকও শৈলজানন্দের কথাসাহিত্যকে ‘ভাবালুতা’ আক্রান্ত বলে মনে করেছেন। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যায় এই মূল্যায়নে ভুল ছিল। পাশ্চাত্য আলোকপ্রাপ্তির চশমা পরে  শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের সাহিত্যের মূল্যায়ন করতে বসে পূর্বজরা এই ভুলটা করে বসেন। তাঁরা রিয়েলিস্ট-ন্যাচারালিস্ট কথাসাহিত্য বলতে একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নের কথাসাহিত্যকে বুঝতেন । শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের কথাসাহিত্যের বাস্তবতার প্রকৃতির সঙ্গে এই বিশিষ্ট প্যাটার্নের তেমন মিল খুঁজে না পেয়েই তাঁরা এরকম যান্ত্রিক সিদ্ধান্তে উপনীত হন। যথার্থ মোহমুক্ত মন নিয়ে শৈলজানন্দ আসলে বাস্তববাদী কথাসাহিত্যের একটা দেশজ মডেল নির্মাণের দিকে ঝুঁকেছিলেন। পাশ্চাত্য ‘রিয়েলিজম’- এর বৈজ্ঞানিক নিরাসক্তি, ‘ন্যাচারালিজম কথিত ‘বংশগতি ও প্রবৃত্তি’ নিয়ন্ত্রিত মানুষের জীবন তাঁরও সাহিত্যের বিষয় হয়েছে। আবার তাঁর কথাসাহিত্যে আছে রোমান্টিকতা। তিনি সচেতনভাবেই এই অন্তর্ঘাত ঘটিয়েছেন। সম্ভবত বাস্তববাদের একটা বিকল্প ধরন সামনে আনার আন্তরিক এষণা থেকেই তাঁর এই প্রয়াস।

এই ‘বিকল্প মডেল’ সম্পর্কে শৈলজানন্দ তেমন কিছু লিখে যাননি। তবে তাঁর গল্প-উপন্যাস মনোযোগ দিয়ে পাঠ করলে এবং সেই সঙ্গে বাঙালির জাতিগত প্রবণতা সম্পর্কে জানা থাকলে এই বিকল্প মডেলটির একটা স্পষ্ট চেহারা পাঠকের চোখে ধরা পড়তে বাধ্য। পাঠক স্পষ্ট উপলব্ধি করবেন পাশ্চাত্য তত্ত্ব  এবং দেশজ বাস্তবতার  এক সহজ মেলবন্ধন সেখানে ঘটানো হয়েছে। তিনি জানতেন যে দেশে তিনি জন্মেছেন সেই দেশের মাটি-পরিবেশ-প্রকৃতি-সংস্কৃতি পাশ্চাত্য দেশগুলির  তুলনায় পুরোপুরি আলাদা। গাঙ্গেয় অববাহিকার মাটি ও পরিবেশের মতো এখানকার মানুষগুলি কোমল প্রাণ। অন্যদিকে পশ্চিমরাঢ়ের   মানুষ সেখানকার ভূপ্রকৃতির মতোই কর্কশ, বন্য। তিনি আরও জানতেন সার্বিকভাবে বাঙালি আবেগে চলে। তাদের ভালোবাসা, তাদের আনন্দের উচ্ছ্বাস যেমন তীব্র,  দুঃখের প্রকাশও তেমনই বাঁধনছাড়া। তাই জীবন-সমস্যার নিরাসক্ত উপস্থাপনা, নীরস বাস্তবমুখী সাহিত্য- সিনেমা তাদের ঘোর অপছন্দের। এই বোধ থেকেই তিনি গল্প, উপন্যাস রচনা করতে বসে পাশ্চাত্য রিয়েলিজম, ন্যাচারালিজমের মূল সূত্রগুলির সঙ্গে যুক্ত করেছেন বাঙালির স্বভাব-বৈশিষ্ট্য। এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে, এক নতুন ধরনের বাস্তববাদ। এই ‘বিকল্প বাস্তববাদ’ পাশ্চাত্য বাস্তববাদের মতো deterministic নয়। তিনি মনে করতেন ব্যক্তি-মানুষের জীবন একরৈখিক গতিতে চলে না। অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সে পাল্টায়। ফলে বাস্তবতাও এক জায়গায় থেমে থাকে না। তার প্রবণতা নিরন্তর ‘হয়ে ওঠা’-র দিকে। অনেক পরবর্তীকালে দার্শনিক দেলুজ বিকল্প বাস্তববাদের তত্ত্ববয়ন করতে বসে একেই বলেছেন ‘বিকামিং' (becoming)। 

বর্ধমান জেলার রানিগঞ্জ– অন্ডাল- আসানসোল অঞ্চলের কয়লাকুঠি কেন্দ্রিক গল্পগুলির মধ্যে শৈলজানন্দের বিকল্প বাস্তববাদের  এই বৈশিষ্ট্যগুলি খুঁজে পাওয়া যায়। সাঁওতাল কুলি-কামিন মানুষগুলি তাদের স্বভাববৈশিষ্ট্য অনুযায়ী  তাঁর গল্পে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ‘কয়লা-কুঠি’ গল্পের বাউরি কন্যা বিলাসী ও সাঁওতাল নানকুর কথাই ধরা যাক। তাদের প্রেম, রিরংসার মধ্যে আছে পরিবেশের স্বাভাবিক বন্যতা। তাদের প্রত্যেকটি আচরণ ও প্রতিক্রিয়ায় চড়া সুর প্রাণবন্ত। তাদের প্রেমের করুণ পরিণতি—-নানকুর বিশ্বাসঘাতকতা, বিলাসীর প্রতিক্রিয়া, নানকুর খুন হওয়ার সংবাদে তার মদ্যপানে বেসামাল হওয়া—শহুরে চোখে এগুলো মেলোড্রামাটিক মনে হতে পারে। কিন্তু শৈলজানন্দ জানতেন ঐ অঞ্চলের  মানুষের জীবনযাপন, চরিত্রে আছে যথেষ্ট নাটকীয় উপাদান। তদুপরি জানতেন বাস্তবতার রূঢ় প্রকাশকে বাঙালি পাঠক সেভাবে নেবে না। তাই  তিনি আখ্যান এবং চরিত্রগুলিকে আবেগে -নাটকীয়তায় ভরে দিয়েছেন। এর ফলে জন্ম নিয়েছে বাস্তববাদের এক অন্য মাত্রা। এই বাস্তবতা তাই এত জীবনীয়। এবং তাই  পাঠকপ্রিয়। 

শৈলজানন্দের বিকল্প বাস্তবতাবোধের আরেকটি  বিশেষ দিক আছে। একে আমরা বলতে পারি  ‘স্বপ্নসুরভিত বাস্তববাদ’। তিনি তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে  দীর্ণ, রিক্ত বাঙালিকে চেয়েছিলেন স্বপ্ন দেখাতে। পঞ্চাশ-ষাটের দশকের বাংলা সিনেমার নির্মাতারাও একই জীবনদৃষ্টি দ্বারা চালিত হয়েছিলেন। আসলে বিশ্বযুদ্ধ-দাঙ্গা-মন্বন্তর ধ্বস্ত বাঙালি ভেবেছিল স্বাধীনতা দুঃখ ঘুচাবে, কিন্তু ঘটল বিপরীত। কর্মহীনতা, দু-মুঠো ভাতের লড়াই ছিল সেদিনের হতভাগ্য বাঙালির  প্রাত্যহিক বাস্তবতা। কিন্তু সেই ধূসর পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে দেখি ‘সপ্তপদী’(১৯৬১) সিনেমার নায়ক-নায়িকা গাইছেন এক স্বপ্নভরা লিরিক,

“এই পথ যদি না শেষ হয়
তবে কেমন হতো তুমি বলো তো?
যদি পৃথিবীটা স্বপ্নের দেশ হয়
তবে কেমন হতো তুমি বলো তো ।।”

সেই কালবেলায় কেন এরকম রোমান্টিক সিনেমা, গানের রচনা? কেন দরিদ্র জনতা সেগুলো প্রাণভরে দেখত, শুনত? আসলে,সিনেমা হলে তারা আসত স্বপ্ন দেখতে, বাঁচার রসদ সংগ্রহ করতে। উত্তম-সুচিত্রার সিনেমা, গান সেই স্বপ্নের অফুরান উৎস ছিল। একইভাবে শৈলজানন্দও চেয়েছিলেন তাঁর গল্প -উপন্যাসের মধ্য দিয়ে এই ধ্বস্ত বাঙালি পাঠকের মনে আশার বীজ বুনে দিতে। তাঁর ‘কয়লাকুঠির দেশ’ সমালোচকদের দ্বারা তিরস্কৃত হলেও জননন্দিত হয়েছিল এই কারণেই।

মালা ও রঞ্জনের প্রেম, তাদের মিলনাত্মক পরিণতি ‘কয়লাকুঠির দেশ’ উপন্যাসের  উপজীব্য। তাদের মিলনের পথে নানা বাধা —-রঞ্জনের অন্তর্ধান, পুকুরে তার মৃতদেহ ভেসে ওঠা, তার খুনের মামলায় মালার পিতার কারাবাস—এসব পড়ে পাঠক ভাবেন তাদের মিলন আর সম্ভব নয়। কিন্তু হঠাৎই  রঞ্জন ফিরে আসে, সত্য উদ্ঘাটিত হয়, বিবাহ সম্পন্ন হয়। সমালোচকদের দৃষ্টিতে এটা অবাস্তব ও রোমান্টিক। লেখকের নিরাসক্তিও সর্বত্র বজায় থেকেছে এমনটা নয়। কিন্তু শৈলজানন্দের নিজস্ব প্রবণতা, বাঙালির স্বভাববৈশিষ্ট্য অনুযায়ী দেখলে এটিও বাস্তববাদী উপন্যাস। তবে অন্য রকমের বাস্তববাদ।  দেলুজ মনে করতেন , বাস্তবতা গঠিত হয় বিভিন্ন ‘ঘটনা’ (event)-র মাধ্যমে। সেগুলি  হঠাৎ করে ঘটে এবং পূর্ববর্তী পরিস্থিতিকে আমূল বদলে দেয়। সর্বোপরি  বাস্তবতা কখনও একরৈখিক নয়; প্রতিটি মুহূর্তে তা ভিন্ন সম্ভাবনার দিকে মোড় নিতে পারে। আলোচ্য উপন্যাসের কাহিনিতে রঞ্জনের আকস্মিক প্রত্যাবর্তন তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা (event )। এর ফলে পুরোনো বাস্তবতার পুনর্গঠন হয়েছে।  এই পরিণতিকে যতই মেলোড্রামাটিক বলা হোক,  সেকালের পাঠক কিন্তু এই ধরনের আখ্যানই পছন্দ করত। এই ধরনের আখ্যান তাদের স্বপ্ন দেখাত,  দুর্দশার মধ্যেও বেঁচে থাকার পাথেয় হয়ে উঠত।

এই বিকল্প বাস্তববাদেরই আরেকটি উল্লেখযোগ্য নমুনা ‘বধূবরণ’। এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র মামাবাড়িতে মানুষ ননীমাধব।   তার কাছে চিঠি লিখতে আসা প্রোষিতভর্তৃকাদের এবং পরবর্তীকালে পিতৃগৃহে সৎমায়ের যৌনবুভুক্ষার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায়  ননীমাধবের এই  ধারণা জন্মায় — বিবাহিত নারী মাত্রেই  প্রবৃত্তিপরায়ণা এবং বিশ্বাসঘাতিনী।এই বিশ্বাসের বশবর্তী হয়েই সে সদ্য বিবাহিত স্ত্রী  গৌরীকে ট্রেন থেকে অজানা স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে নিজে অন্য ট্রেনে উঠে পড়ে। এই পর্যন্ত পাঠ করে পাঠকের মন তার প্রতি বিতৃষ্ণায়  ভরে ওঠে। কিন্তু এরপরেই আখ্যান অন্যদিকে মোড় নেয়। ননীমাধবের অন্তর্দহন শুরু হয়। তার মনে হতে থাকে ‘নিখিল ব্যাপী এই মিথ্যাচারের বাহিরে সত্যবস্তু হয়ত বা কোথাও কিছু থাকিতেও পারে।’ এই উপলব্ধি তার মনকে বদলে দেয়। তারপর গৌরীর কাছে তার ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিতেই আখ্যানের সমাপ্তি।  বাস্তববাদী সমালোচক এখানেও রোমান্টিক ভাবালুতা, মেলোড্রামার অভিযোগ তুলবেন। কিন্তু আমরা বলব, ননীমাধবের হৃদয়পরিবর্তন অনেকটাই রেভিলেশনের মতো। আসলে জীবন এরকমই। পাঠকেরা ননীমাধবকে ঘৃণা করতে শুরু করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার পরিবর্তিত আচরণ অভিনন্দিত হয়। সে গৌরীর কাছে ফিরে যাবে, তাদের জীবন ভরে উঠবে  মিলনের সৌরভে এই কথা ভেবে  পাঠক শেষ পর্যন্ত স্বস্তির শ্বাস ফেলে।

এই আশাবাদী মানসিকতাই প্রাণময় হয়ে উঠেছে  ‘নারীর মন’, ‘জননী’, ‘রাখাল মাস্টার’, ‘জয় পরাজয়’ গল্পে; ‘বানভাসি’, ‘ষোল আনা’, ‘মহাযুদ্ধের ইতিহাস’, ‘নীহারিকা ওয়াচ কোম্পানি’, ‘পাতালপুরী’ উপন্যাসে। এই গল্প এবং উপন্যাসগুলি সেকালের পাঠক বারবার পাঠ করেছে। সংগ্রহ করেছে  জীবনের বাঁচার রসদ। সাম্প্রতিক কালের বাংলা কথাসাহিত্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রাণহীন। সেগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পাঠককে টানে না।  আজকের জীবনযুদ্ধে ধ্বস্ত বাঙালি পাঠক তাই শৈলজানন্দের আশা জাগানিয়া, স্বপ্নস্নিগ্ধ কথাসাহিত্যধারার পুনরুজ্জীবন চায়। তারই জন্য আজও তারা শর্বরীর প্রতীক্ষায়।