উদ্দালক
রাজ্যে পালাবদলের একমাস পেরিয়ে গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ এমন এক রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে, এর আগে যা দেখা যায়নি। রাজ্যের বিদায়ী শাসকদলের এরকম পরিণতি এর আগে কখনও এমন হয়নি।
যে দল বিদায় নিয়েছে, একমাসের মধ্যে তাদের প্রথম সারির এতজনের গ্রেপ্তারি, সংগঠন ধুলোয় মিশে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি এর আগে কখনও হয়নি। স্বাভাবিক কারণে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে বদলের ইঙ্গিত মিলছে।
মূল বিধানসভা নির্বাচনের পরে ফলতা পুনর্নির্বাচন প্রমাণ করে দিয়েছে, শাসক বিরোধীর সমীকরণে আসন্ন বদল। দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে বামেরা। বিপুল দুর্নীতি আর দাদাগিরির মাশুল দিয়ে ক্রমে ভোটের অঙ্কে পিছিয়ে পড়েছে ঘাসফুল শিবির।
ফলে এই কথা বলা চলে যে ভোটের একমুখী বদল যদি শাসক পরিবর্তন হয়, অন্য মুখে বদল হতে পারে বিরোধীরও। কিন্তু আদতে কি তাই?
এখনই এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া মুশকিল। তৃণমূল সরকার থাকাকালীন যা লুকিয়ে ছিল, সেই দুর্নীতির নানান অভিযোগ সামনে আসছে। এমন সব বেনিয়মের কথা প্রকাশ্যে এসে পড়ছে, যা লজ্জার এবং রাজনৈতিক তর্কে যেগুলির আত্মপক্ষ সমর্থন কার্যত অসম্ভব।
স্বাভাবিক ভাবে সাধারণ মানসে তৈরি হয়েছে এক রকমের বিরোধী শূন্যস্থান। বিজেপি বিরোধী ভোট, তৃণমূলকে দিতে অনেকেরই বিবেকে বাঁধছে! বাঁধবে নাই বা কেন? বিভিন্ন নেতাদের বিলাসবহুল জীবন, নিজস্ব ক্ষেত্রে ভয়ানক দুর্নীতি, হপ্তা তোলার সংস্কৃতি এখন প্রতিদিন স্পষ্ট হচ্ছে।
এই সমস্ত কিছু জেনেও কেন মানুষ ভোট দেবে? কোন মুখে ভোট চাইতে যাবেন তৃণমূলের সমর্থকরা মানুষের কাছে? আর সেই কারণেই তৈরি হয়েছে বিরোধী শূন্যস্থান।
সেই শূন্যস্থানের পথ ধরেই রাজ্যে ফের উঠে আসছে বাম জোট। হকার উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলনে বামেদের হুড়মুড়িয়ে নেমে পড়া এবং তৃণমূলের অনুপস্থিতি সে কথা প্রমাণ করে দিয়েছে।
বামেরা যেন মনে করছে, তাদের জয়ের জন্য আছে পুরোটাই, অন্যদিকে ক্ষমতা হারিয়ে দিশেহারা হয়ে খেই হারিয়ে ফেলেছে তৃণমূল।
শুধু বামেরাই নয়, কংগ্রেস–সহ তৃণমূল ভিন্ন বিজেপি বিরোধী শক্তিগুলো যেন নতুন করে বাঁচতে চাইছে। মেখলিগঞ্জ পুরসভায় রদবদল প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বকে অনেকদিন পর আলোচনায় ফিরিয়ে এনেছে।
ভোটের বিচারে তারাও নতুন করে উঠে দাঁড়াতে চাইছে। এর মধ্যে বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তৃণমূলের একটা অংশের কংগ্রেসে ফিরে যাওয়ারও। বিভিন্ন মহল থেকে শোনা যাচ্ছে, কয়েকজন ছাত্রনেতা- সহ সাংগঠনিক স্তরের কর্মী ও নেতারা কংগ্রেসের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করছেন, তাদের কেউ কেউ আগামী ২১ জুলাই হাত শিবিরে যোগ দিতেও পারেন।
ফলে, ২০১১ পরবর্তী সময়ে রাজ্যে কংগ্রেসের হাল অনেকদিন বাদে ফিরতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে সাংবাদিক বৈঠক করে প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী বলেই দিয়েছেন, তৃণমূল স্তরের ঘাসফুল কর্মীদের জন্য কংগ্রেসের দরজা খোলা থাকছে। সব মিলিয়ে এই সুযোগে কংগ্রেসও নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নিতে চাইছে।
তবে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকেই বামেরা পুরোদমে মাঠে নেমে পড়েছে। নতুন সরকারের মন্ত্রিসভা পুরো গঠন করার আগেই আর কোন রাজ্যে আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে, তা অনেকেই হিসেব করে বলতে পারবেন না। এই রাজ্যে সেটা শুরু হয়েছে।
পালাবদলের পর বামেদের অনেক পার্টি অফিস নতুন করে খুলেছে। তৃণমূলের ‘সন্ত্রাসে’ মুখ বন্ধ করে থাকা অনেক বাম কর্মী সমর্থক এখন নিয়মিত পার্টি অফিসে যাচ্ছেন, মিছিল মিটিংয়ে অংশ নিচ্ছেন।
জেলায় জেলায় বিভিন্ন স্তরে ছোট বড় কর্মসূচি নিয়েই চলেছে বামেরা। সেখানে একটু আধটু সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না, এমনও নয়। ২০২১ সালে বামেদের আসন ছিল শূন্য, এবারে একমাত্র বিধায়ক হিসেবে জয় পেয়েছেন ডোমকলের মুস্তাফিজুর রহমান।
আর তাতেই ভেন্টিলেশন থেকে বেরিয়ে আসার অক্সিজেন খুঁজে পাচ্ছে বাম জোট। কিন্তু দীর্ঘ ১৫ বছরের অনভ্যাস ও ৩৪ বছরের ধূসর কিন্তু তাও স্পষ্ট স্মৃতির বিরুদ্ধে তাদের লড়তে হচ্ছে, হবেই। বামেরাও পারে, এই বিশ্বাস বাংলার মানুষ আদৌ করবেন কী না, সেটাই এখন দেখার।
কথায় বলে, কারও পৌষমাস, কারও সর্বনাশ। কিন্তু একের সর্বনাশে বহুর পৌষমাস, এরকমটা সচরাচর দেখা যায় না। সংবাদমাধ্যম নির্বাচনের পর থেকে যত না স্ক্রিনটাইম খরচ করেছে ভূলুণ্ঠিত তৃণমূলকে নিয়ে ততটা নজর দেয়নি বাকি বিরোধীদের দিকে।
সেই কারণে আপাতভাবে বিষয়টা ততটা গুরুত্বপূর্ণ মনে না হলেও রাজনীতির ছাত্রদের কাছে এই নির্বাচন এই জন্যেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হয়তো সেই জন্যই ২০১১ সালে তৃণমূল সরকারের হানিমুন পিরিয়ডের সময়েই বাম নেতৃত্বের দেওয়া সাবধানবাণী ফিরে আসছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
সেই কারণেই ইতিউতি নজরে পড়ছে গা-ঝাড়া দিয়ে ওঠা বাম বা কংগ্রেসের সমর্থকদের জটলা। অনেকেই বলছেন, বাংলার রাজনীতি যেন টাইম মেশিনে করে ফিরে গিয়েছে বছর কুড়ি আগে। তবে ভোটের পর সবে একমাস কেটেছে। এর সুদূরপ্রসারী ফল না দেখে এখনই কোনও নিশ্চিত সিদ্ধান্তে আসাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।















