অরিত্র মজুমদার: বিশ্বকাপের ট্রফি হয়তো কোনোদিনও নেইমারের হাতে উঠবে না। কিন্তু তাই বলে কি তিনি হেরে গেলেন? আমার মনে হয়, না।
কারণ ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ থাকেন, যাদের সাফল্য পদক দিয়ে মাপা যায় না। যাদের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় তারা বারবার ভেঙে পড়েও আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন। নেইমার সেই মানুষদেরই একজন।
একটা সময় ব্রাজিলের রাস্তায় ছোট্ট একটা ছেলেকে দেখে মানুষ বলত, এই ছেলেটা নাকি বল নিয়ে দৌড়ায় না, বলটা যেন ওর পায়ের কথা শোনে। স্যান্টোসের জার্সিতে সেই জাদু একদিন পুরো পৃথিবী দেখল। অল্প বয়সেই তাকে তুলনা করা হতে লাগল পেলে-র সঙ্গে। তারপর এল বার্সেলোনা। এলো ইতিহাস। এলো ইউরোপ জয়। তারপর বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলার হিসেবে প্যারিস সাঁ জাঁ-তে যোগ দেওয়া। সবাই ভেবেছিল এবার শুরু হবে নতুন যুগ। কিন্তু ভাগ্য যেন অন্য এক চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল।
ফুটবল ইতিহাসে খুব কম খেলোয়াড়ই আছেন, যাঁদের প্রতিভার সঙ্গে এত নির্মম ব্যবহার করেছে শরীর। একবার পায়ের হাড় ভাঙল। একবার গোড়ালি। আবার লিগামেন্ট। আবার হাঁটু। আবার পেশির চোট। যখনই মনে হয়েছে “এবার নেইমার ফিরেছে” - ঠিক তখনই যেন কোথা থেকে আরেকটা ইনজুরি এসে সবকিছু থামিয়ে দিয়েছে। শুধু বড় ইনজুরিই নয়। ছোট ছোট চোট, বারবার ম্যাচের বাইরে থাকা, পুনর্বাসনের অন্তহীন দিন এসব মিলিয়ে তাঁর ক্যারিয়ারের বহু মাস কেটেছে হাসপাতাল, জিম আর ফিজিওথেরাপির ঘরে। পৃথিবী যখন স্টেডিয়ামে তাঁর জাদু দেখার অপেক্ষায় ছিল, তিনি তখন শিখছিলেন আবার হাঁটতে, আবার দৌড়াতে, আবার বল ছুঁতে।
২০১৪ সালের বিশ্বকাপ। নিজের দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ। একটা জাতির কোটি কোটি স্বপ্নের কেন্দ্র ছিলেন তিনি। কোয়ার্টার ফাইনালে পিঠে সেই ভয়াবহ আঘাত। স্ট্রেচারে করে মাঠ ছাড়ার সময় তাঁর চোখের জল শুধু একজন ফুটবলারের ছিল না; সেটা ছিল একটা দেশের ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের জল। কয়েক দিন পর হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তিনি দেখলেন সেই অবিশ্বাস্য ৭-১।

ভাবুন একবার। যে ছেলেটা মাঠে থাকলে হয়তো ফল বদলাত কি না, তা কেউ জানে না - সে নিজের দলকে ভেঙে পড়তে দেখছে, অথচ কিছুই করতে পারছে না। এই অসহায়তার যন্ত্রণা কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানো যায় না। তারপরও তিনি ফিরলেন।
২০১৮। ২০২২। আবার চেষ্টা। আবার স্বপ্ন। আবার কান্না। মানুষের একটা বড় অংশ শুধু তাঁর ড্রিবল নয়, তাঁর পড়ে যাওয়াকেও মনে রেখেছে। সোশ্যাল মিডিয়া তাঁকে নিয়ে অসংখ্য মিম বানিয়েছে। “ডাইভার”, “অভিনেতা”, “নাটকবাজ” - কত তকমাই না দেওয়া হয়েছে!
কিন্তু আমরা খুব কম মানুষই ভেবে দেখি, একজন খেলোয়াড় বছরের পর বছর প্রতিপক্ষের সবচেয়ে বেশি ফাউলের শিকার হলে, বারবার একই জায়গায় আঘাত পেলে, তার শরীরের ওপর সেই প্রভাব কতটা গভীর হয়।
২০২৩ সালে আল হিলাল এসএফসি তে যোগ দেওয়ার পর এল আরও বড় ধাক্কা। হাঁটুর লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেল। অনেকেই বলেছিলেন এবার তার ক্যারিয়ার শেষ। ৩১-৩২ বছর বয়সের পর এমন চোট সারিয়ে আগের মতো ফর্মে ফিরে আসা খুবই কঠিন। ফুটবল বিশ্লেষকেরা তাঁকে প্রায় অবসরপ্রাপ্ত হিসেবেই ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু নেইমার অন্যরকম। ব্যতিক্রমী। তিনি ফিরে গেলেন নিজের শিকড়ে। স্যান্টোস এফসি তে। যেখান থেকেই সবকিছুর শুরু হয়েছিল। সেখানে আবার নতুন করে দৌড়াতে শিখলেন। নতুন করে নিজের শরীরকে বিশ্বাস করতে শিখলেন। আবার ইনজুরি এল। আবার থামলেন। আবার ফিরলেন।
বিশ্বকাপে নেইমারের শেষ অধ্যায়। মাত্র পঁচিশ-ত্রিশ মিনিট। তবু সেই সামান্য সময়েই মনে হচ্ছিল, বহুদিন ধরে নিভে থাকা এক আতশবাজির বুকের ভেতর জমে থাকা বারুদে কেউ যেন আবার আগুন ছুঁইয়ে দিয়েছে। এক ঝলক। এক মুহূর্ত। কিন্তু সেই আলোই বুঝিয়ে দিল, আগুনটা এখনও পুরো নিভে যায়নি। নরওয়ের গোলরক্ষক ওরইয়ান নাইল্যান্ড তখন একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ করে ফুঁসছেন। হয়তো তিনি জানতেনই না, সময়ের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি কাকে চ্যালেঞ্জ করছেন! কাকে টিটকিরি দিচ্ছেন! কাকে নীরবে অপমান করছেন! তারপর এল সেই পেনাল্টি। নেইমার এগিয়ে এলেন। চেনা ছোট ছোট পা ফেলা। এক মুহূর্তের বিরতি। এক ফোঁটা নৈঃশব্দ্য। আর তারপর… নাইল্যান্ড আর নড়তেই পারলেন না। বল জালে জড়িয়ে গেল। যেন শেষবারের মতো জেগে উঠল জোগো বোনিতো। যেন শেষবারের মতো বলটা বলল - “আমি এখনও ব্রাজিল।” হয়তো এটাই ছিল নেইমারের শেষ বিশ্বকাপ গোল। শেষ স্পর্শ। শেষ জাদু। সব কিংবদন্তি ট্রফি নিয়ে বিদায় নেন না। কেউ কেউ বিদায় নেন একটা আলোর রেখা রেখে, যা নিভে যাওয়ার পরও অনেকক্ষণ চোখে ভাসতে থাকে।

এই “আবার” শব্দটাই বোধহয় নেইমারের সবচেয়ে বড় পরিচয়। আমরা প্রায়ই সাফল্যকে ট্রফি দিয়ে মাপি। কিন্তু মানুষের আসল পরিচয় হয়তো অন্য কোথাও। যে মানুষটা দশবার পড়ে গিয়েও এগারোবার উঠে দাঁড়ায়, সে হয়তো ট্রফি না জিতেও জীবনের কাছে জিতে যায়। নেইমারের গল্প আসলে ফুটবলের গল্প নয়। এটা মানুষের গল্প। যে গল্প শেখায় সমালোচনা তোমাকে সংজ্ঞায়িত করে না। ব্যর্থতা তোমার পরিচয় নয়। শরীর ভেঙে যেতে পারে, কিন্তু মন যদি না ভাঙে, তাহলে প্রত্যাবর্তনের দরজা কখনও বন্ধ হয় না। আমাদের জীবনেও তো এমন হয়। একটা পরীক্ষায় খারাপ ফল। একটা চাকরির ইন্টারভিউয়ে ব্যর্থতা। একটা ব্যবসা ভেঙে যাওয়া। একটা সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়া। তারপর আমরা ভাবি - সব শেষ।
নেইমারের জীবন যেন প্রতিদিন আমাদের উল্টো কথাটাই বলে। শেষ মানে শেষ নয়। যতক্ষণ নিজের ওপর বিশ্বাস আছে, ততক্ষণ প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাও আছে। হয়তো নেইমার বিশ্বকাপ জিতবেন না। হয়তো তাঁর ক্যারিয়ারে সেই একমাত্র অপূর্ণতাটুকু থেকেই যাবে। কিন্তু সব অসম্পূর্ণতাই ব্যর্থতা নয়। কিছু অসমাপ্ত গল্পই একদিন মানুষের সবচেয়ে বড় প্রেরণা হয়ে ওঠে।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন , “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।”
নেইমারও যেন নিজের পথটা সেভাবেই হেঁটেছেন। প্রশংসা ছিল। সমালোচনাও ছিল। হাসি ছিল। চোখের জলও ছিল। তবু তিনি থামেননি। হয়তো এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ। ট্রফির নয়। মানুষকে লড়াই করতে শেখানোর।
ধন্যবাদ, নেইমার। তুমি হয়তো কাপ জিততে পারোনি। কিন্তু ভেঙে পড়েও কীভাবে আবার উঠে দাঁড়াতে হয়, সেই পাঠ তুমি একটা প্রজন্মকে দিয়ে গেলে। আর সেই শিক্ষা যেকোনো ট্রফির চেয়েও বড়।















