ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাল কিছু বললেই অনেক সময় আমরা বলে উঠি- ‘টাচউড’। কেউ আবার সঙ্গে সঙ্গে কাঠের টেবিল, চেয়ার বা দরজায় হাত ছুঁয়ে নেন। এই অভ্যাসটি এতটাই পরিচিত যে ঠিক কারণে টাচউড ব্যবহার করা হয় তা না জেনেই অনেকে বলে থাকেন। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে বহু বছরের পুরনো ইতিহাস এবং প্রচলিত বিশ্বাস।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘টাচউড’ বলার শুরু প্রাচীন ইউরোপে। সেই সময় মানুষ গাছকে খুব পবিত্র মনে করত। তাদের বিশ্বাস ছিল, বড় বড় গাছের মধ্যে দেবতা বা ভাল আত্মারা বাস করেন। বিপদ থেকে বাঁচতে বা অশুভ কিছু দূরে রাখতে মানুষ গাছের কাণ্ড স্পর্শ করত। সেসময় মনে করা হত, কাঠে হাত রাখলে শুভ শক্তি মানুষকে রক্ষা করবে।
পরে খ্রিস্টধর্ম ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বিশ্বাস আরও একটি অর্থ পায়। অনেকেই মনে করেন, কাঠের সঙ্গে যিশুখ্রিস্টের ক্রুশের সম্পর্ক রয়েছে। যিশু যে কাঠের ক্রুশে বিদ্ধ হয়েছিলেন, সেটিকে পবিত্র মনে করা হত। তাই কাঠ স্পর্শ করলে ঈশ্বরের আশীর্বাদ পাওয়া যায়, এমন ধারণাও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই কারণেও কাঠে হাত দেওয়ার অভ্যাস সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।
আর একটি প্রচলিত বিশ্বাস হল, ‘জিনক্স’ বা ভাগ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়। অনেকের ধারণা, নিজের ভাল সময় বা ভবিষ্যতের সাফল্যের কথা বেশি বললে অশুভ কিছু ঘটতে পারে। তাই ভাল কথা বলার পর ‘টাচউড’ বলে মানুষ যেন নিজের ভাগ্যকে রক্ষা করতে চায়। এটি এক ধরনের সতর্কতা বা সাবধানতার প্রকাশ।
এই রীতির ব্যবহার সব দেশে এক রকম নয়। ইংল্যান্ডে বলা হয় ‘টাচ উড’, আমেরিকায় বলা হয় ‘নক অন উড’। কোথাও কাঠে হালকা টোকা দেওয়া হয়, আবার কোথাও শুধু স্পর্শ করলেই হয়। ভারতেও ইংরেজি ভাষার প্রভাবে ‘টাচউড’ শব্দটি খুব পরিচিত হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে শহরের মানুষজনের মধ্যে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই ধরনের বিশ্বাস মানুষের মানসিক শান্তির সঙ্গে জড়িত। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত-এই ভাবনা থেকেই মানুষ ছোট ছোট রীতির ওপর ভরসা করে। এতে বাস্তবে কিছু না বদলালেও, মনে একটা ভরসা তৈরি হয়।
বলা যায়, ‘টাচউড’ শুধুই একটি শব্দ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের ভয়, আশা, বিশ্বাস আর শতাব্দী পেরনো এক ইতিহাস। তাই পরের বার ভাল কিছু বলার পর ‘টাচউড’ বললে বুঝবেন, আপনি অজান্তেই এক পুরনো বিশ্বাসকে বাঁচিয়ে রাখছেন।
