মাঝ এপ্রিল আসতে না আসতেই গরমে-ঘামে প্রাণান্তকর অবস্থা। ঘরে-বাইরে যে কোনও কাজ মানেই হাঁসফাঁস। এই অবস্থায় যদি রান্নাঘরে আগুন তাতে কাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কারই বা মেজাজ বশে থাকে? শুধু খুন্তি নাড়া তো আর নয়! জোগাড়যন্ত্র করো, আনাজ কাটো, মশলা কষাও, রাঁধো। বাসনের পর বাসন জমবে সিঙ্কে, রান্নাঘরের স্ল্যাবে ছড়িয়ে থাকবে মশলার গুঁড়ো, হাতা-খুন্তিতে তেলের পরত। রান্না শেষে সেই সাফাইপর্বও নেহাত কম নয়!
এমনিতেই আগুনে আঁচে পোড়াচ্ছে সূর্য। সেখানে রান্নাঘরের হ্যাপা কমালে রাগের পারদ যদি একটু কমে, তা হলে তো ভালই হয়, তাই না? সর্বনেশে গ্রীষ্মর দিনগুলোতে বরং তাই ভরসা রাখতে পারেন এক পাত্রেই রান্না সেরে ফেলার মতো পেটভরানো পদগুলোতে, যাদের পোশাকি নাম ওয়ান পট মিল। আমিষ হোক বা নিরামিষ, দেশি হোক বা বিদেশি— এমন পদের সংখ্যা কিন্তু নেহাত কম নয়। রান্নার জোগাড় করতে লাগে কম সময়, রাঁধতেও তাই। খেয়েও যে আরাম হবে, বলাই বাহুল্য। আর একই পাত্রে পুরোটা রান্না করে ফেলা যায় বলে বাসনও জমে কম। হাঁসফাঁস গরমে রান্নাঘরের পাট সহজে চুকিয়ে ফেলতে শিখবেন নাকি এমন কিছু রেসিপি?
পিশপাশ
ভাতের মধ্যে সবজি, মাংস হাজির। হাল্কা রান্না, পেটের পক্ষেও আরামদায়ক। অ্যাংলো ইন্ডিয়ান এই রান্না পথ্য হিসেবে মা-ঠাকুমাদের ভারী পছন্দের ছিল।
যা লাগবেঃ গোবিন্দভোগ চাল-২ কাপ, বোনলেস চিকেনের টুকরো-৩৫০ গ্রাম, ডুমো ডুমো করে কাটা আলু, গাজর, একটু বড় করে কুচোনো বিন, মিহি করে কুচোনো আদা- ১ চা চামচ, গোটা গোলমরিচ – আধ টেবিল চামচ, তেজপাতা – ২/৩টে, এলাচ- ২/৩টে, দারচিনি – ১টা, গোলমরিচ গুঁড়ো – ১ চা চামচ, মাখন – ২ টেবিল চামচ, সাদা তেল – ১ টেবিল চামচ, নুন ও চিনি – স্বাদ মতো, জল, পাতিলেবু- ১টি
যেভাবে বানাবেনঃ অল্প একটু পাতিলেবুর রস, সামান্য নুন ও গোলমরিচ গুঁড়ো দিয়ে চিকেনের টুকরো গুলো ম্যারিনেট করে রাখুন। চাল মিনিট ১৫ ভিজিয়ে রেখে, ভাল করে ধুয়ে, জল ঝরিয়ে রেখে দিন।
এবার ঢাকনা খোলা প্রেশার কুকার বা বড় একটা পাত্র গ্যাসে বসিয়ে তাতে আধ টেবিল চামচ সাদা তেল গরম করুন। তাতে প্রথমে চিকেনের টুকরোগুলো ভেজে তুলে রাখুন। এবার আধ টেবিল চামচ তেল এবং ১ টেবিল চামচ মাখন দিয়ে তাতে তেজপাতা, গোটা গরম মশলা এবং গোটা গোলমরিচ দিয়ে নাড়াচাড়া করুন। এরপর তার মধ্যে দিয়ে দিন আদাকুচি, সব্জি এবং আলু। কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করার পরে তাতে চাল দিয়ে নাড়তে থাকুন। পরিমাণমতো নুন, সামান্য চিনি এবং ভেজে রাখা চিকেনের টুকরোগুলো দিয়ে ভাল করে মিশিয়ে নিন সবকিছু। এবার ৬-৭ কাপ গরম জল দিয়ে দিন। দেখবেন, চাল যেন পুরোপুরি ডুবে যায়। প্রেশারকুকারে রান্না করলে এবার তাতে ঢাকনা লাগিয়ে ১টা সিটি দিয়ে নামিয়ে নিন। খোলা পাত্রে রান্না করলে ১৫-২০ মিনিট সেদ্ধ হতে দিন। সিটি দেওয়ার পরে প্রেশার কুকারের ঢাকনা খুলে বা খোলা পাত্রে রান্না করলে ভাত সেদ্ধ হয়ে এলে আরও একবার নেড়েচেড়ে দিন। উপর থেকে মাখন ছড়িয়ে গরমগরম পিশপাশ পরিবেশন করুন।
চানা ডাল তেহরি
নিরামিষ অথচ একটু অন্য রকম কোনও সহজ ওয়ান পট মিলের খোঁজে আছেন? চানা ডাল তেহরি হতেই পারে আপনার মুশকিল আসান।
যা লাগবেঃ চাল- ২ কাপ, ছোলার ডাল- ১ কাপ, সাদা তেল- ২ টেবিল চামচ, গোটা জিরে – ১ চা চামচ
তেজপাতা – ২টো, দারচিনি- আধ ইঞ্চি টুকরো, বড় এলাচ – ১টা, ছোট এলাচ – ১ টা, লবঙ্গ – ৪/৫টা, গোলমরিচ – আধ চা চামচ, আদা রসুন বাটা – ১ চা চামচ, লাল লঙ্কাগুঁড়ো – ১ চা চামচ, হলুদ গুঁড়ো – আধ চা চামচ, গরম মশলা গুঁড়ো – আধ চা চামচ, ধনে গুঁড়ো – ১ চা চামচ, নুন, চিনি – স্বাদ মতো, কুচোনো টোম্যাটো – ২টো, কুচোনো পেঁয়াজ- ২টো, কাঁচা লঙ্কা – ৪/৫টা, জল

যেভাবে বানাবেনঃ চাল ও ডাল ভাল করে ধুয়ে আলাদা বাটিতে ভিজিয়ে রাখুন। প্রেশার কুকারে তেল গরম করে তাতে দিয়ে দিন গোটা জিরে, এলাচ, দারচিনি, তেজপাতা, লবঙ্গ এবং গোলমরিচ। জিরের দানা চড়বড় করতে শুরু করলে কুচোনো পেঁয়াজ মিশিয়ে দিন। সব একসঙ্গে ভাজতে থাকুন যতক্ষণ না পেঁয়াজে সোনালি রং ধরছে। এরপরে তাতে মিশিয়ে দিন আদা রসুন বাটা, কাঁচালঙ্কা এবং ভিজিয়ে রাখা ডাল। মাঝারি আঁচে ৫-৬ মিনিট সমানে নাড়াচাড়া করে রান্না করুন। তেল ছেড়ে এলে কুচোনো টোম্যাটো, বাকি সব মশলা গুঁড়ো এবং পরিমাণ মতো নুন-চিনি মিশিয়ে মাঝারি আঁচে আরও ৪-৫ মিনিট রাঁধতে থাকুন টোম্যাটো নরম হয়ে আসা পর্যন্ত। এবারে প্রেশার কুকারে চাল ও পুরোটা সেদ্ধ হওয়ার মতো জল দিয়ে ঢাকনা লাগিয়ে বসান। একটা সিটি দেওয়ার পরে একেবারে কম আঁচে আরও মিনিট পনেরো সেদ্ধ হতে দিন। এবার কুকারের ঢাকনা খুললে দেখবেন চানা ডাল তেহরি তৈরি। একটু ঘি আর ধনেপাতা কুচি ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।
ওয়ান পট ফিশ-কোকোনাট কারি
বাঙালির আবার কবে মাছ ছাড়া চলেছে! তা হলে তারই বা ওয়ান পট মিল হবে না কেন? জিভ যদি চায় ভিনদেশি স্বাদ, এ পদ রেঁধে দেখতেই পারেন।
যা লাগবেঃ বাসা মাছের ফিলে- ৫০০ গ্রাম, বাদাম তেল – ১ টেবিল চামচ, মিহি করে কুচোনো পেঁয়াজ – ১টা
মিহি করে গ্রেট করা আদা – ১ টেবিল চামচ, জিরে গুঁড়ো- ২ চা চামচ, ধনে গুঁড়ো – ১ চা চামচ, হলুদ গুঁড়ো – আধ চা চামচ, নারকেলের দুধ – ২০০ মিলিলিটার, ছোট ছোট টুকরো করা মিষ্টি আলু- ৪০০ গ্রাম, লম্বাটে টুকরো করা বিন – ২০০ গ্রাম, অর্ধেক করে কেটে টুকরো করা জুকিনি – ১টা, গন্ধরাজ লেবুর টুকরো – ৪টে
কাঁচা লঙ্কা- ৩/৪টে, জল- ২০০ মিলিলিটার, ধনে পাতা কুচোনো, সেদ্ধ করে রাখা ব্রাউন রাইস

যেভাবে বানাবেনঃ মাঝারি আঁচে একটা বড় সসপ্যান বসান। তাতে তেল গরম করে পেঁয়াজ ভেজে নিন নরম হয়ে আসা পর্যন্ত। এরপরে কুচোনো আদা, হলুদ-ধনে-জিরে গুঁড়ো মিশিয়ে কষাতে থাকুন। মশলার গন্ধ বেরোলে তাতে নারকেলের দুধ, জল ঢেলে আলুর টুকরোগুলো মিশিয়ে ফোটাতে থাকুন। সবটা ফুটে উঠলে আঁচ কমিয়ে ঢাকা দিয়ে আরও ৮-১০ মিনিট রান্না হতে দিন। এবার বিনের টুকরো মিশিয়ে ঢাকা দিন। মিনিট দুয়েক তা নরম হওয়া পর্যন্ত রান্না হোক। এর পর জুকিনি এবং মাছের ফিলে মিশিয়ে আরও ৩-৪ মিনিট রান্না করুন। মাছ ঠিকমতো রান্না হওয়া এবং সবজি নরম হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। সব শেষে গন্ধরাজ লেবুর টুকরো, কাঁচা লঙ্কা এবং ধনেপাতা কুচি ছড়িয়ে ভাতের সঙ্গে গরম গরম পরিবেশন করুন।
আজ কোনটা বানাচ্ছেন তাহলে?















