চিকিৎসা বিজ্ঞানের চরম উন্নতির আড়ালে মানুষের অসহায়তাকে মূলধন করে এমন এক হাড়হিম করা ব্যবসার পর্দা ফাঁস হল, যা শুনে শিউরে উঠছে গোটা দেশ। অন্ধকারের এই ব্যবসার খবর যে কোনও থ্রিলারের চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। সেকেন্দ্রাবাদের এক নামী বেসরকারি স্পার্ম  ব্যাঙ্কে অতর্কিতে হানা দিয়ে পুলিশ যে চক্রের হদিশ পেল, তার মূল শিকার শহরের গৃহহীন, ফুটপাতবাসী ও ভিখারিরা!

ক্ষুধার্ত মানুষের পেটের টান আর টাকার লোভকে অস্ত্র করে রমরমিয়ে চলছিল কোটি কোটি টাকার বেআইনি সারোগেসি এবং সন্তান কেনাবেচার আন্তর্জাতিক চক্র।

সেকেন্দ্রাবাদের ওই নামী ক্লিনিকের কর্মচারীরা প্রতিদিন সকাল হলেই নজর রাখত শহরের বড় বড় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের বাইরে। সেখানে দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা করাতে এসে যে সমস্ত দরিদ্র মানুষ ফুটপাতে রাত কাটাতেন কিংবা যারা পেশায় ভিখারি, তাঁদেরই মূলত ‘টার্গেট’ করা হতো।

টাস্ক ফোর্সের তদন্তে উঠে এসেছে গা শিউরে ওঠা মোডাস অপারেন্ডি:

প্রথম টোপ: দিনভর না খাওয়া ক্ষুধার্ত মানুষদের প্রথমে দেওয়া হতো এক প্যাকেট গরম সুস্বাদু বিরিয়ানি।

নগদ টাকার লোভ: বিরিয়ানি খাওয়ার পর তাঁদের হাতে গুঁজে দেওয়া হত নগদ ৪,০০০ থেকে ৬,০০০ টাকা।
বাথরুমে গোপন খেলা:  টাকার বদলে তাঁদের বলা হতো— “একটা ছোট্ট কাজ করতে হবে।” এরপর তাঁদের ক্লিনিকের ভেতরের একটি বিশেষ গোপন ঘরে বা বাথরুমে নিয়ে গিয়ে সংগ্রহ করা হতো স্পার্ম বা শুক্রাণুর স্যাম্পল। ওই দরিদ্র মানুষেরা জানতেনও না, মাত্র এক প্যাকেট বিরিয়ানির বিনিময়ে তাঁদের শরীর নিয়ে কী ভয়ঙ্কর খেলা খেলছে ডাক্তার ও ক্লিনিকের একাংশ!

পুলিশ জানিয়েছে, এটি কেবল বেআইনিভাবে স্যাম্পল সংগ্রহের মামুলি ঘটনা নয়। উদ্ধার হওয়া নথিপত্র ঘেঁটে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, সেকেন্দ্রাবাদের এই ক্লিনিকটি আসলে একটি বিশাল ‘বেবি সেলিং র্যাঁকেট’ বা সন্তান কেনাবেচা চক্রের প্রধান সাপ্লাই চেইন ছিল।

এখান থেকে সংগৃহীত স্যাম্পলগুলি বিশেষ কোল্ড চেইনের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেওয়া হতো গুজরাটের আহমেদাবাদের বেশ কিছু নামী ফার্টলিটি সেন্টারে। সেখানে নিঃসন্তান ধনী দম্পতিদের থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে, তাঁদের অজান্তেই এই ফুটপাতবাসীদের স্পার্ম ব্যবহার করে টেস্টটিউব বেবি বা সারোগেসির মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেওয়া হতো।

ঘটনাস্থল থেকে ইতিমধ্যেই ১৬টি তাজা স্যাম্পল এবং বস্তা বস্তা নথিপত্র বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ। ক্লিনিকের ম্যানেজার ও অপারেটর সহ মোট ৭ জনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।


ভারতে আইনত স্পার্ম ডোনেশন বৈধ হলেও, তার জন্য রয়েছে কঠোর এবং নির্দিষ্ট আইনি গাইডলাইন (ART Act):

আইন অনুযায়ী, যে কোনও ধরনের ডোনেশন সম্পূর্ণ  ঐচ্ছিক হতে হবে। ডোনরের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, পারিবারিক ইতিহাস এবং সবচেয়ে বড় কথা— তাঁর লিখিত সচেতন সম্মতি বাধ্যতামূলক। কাউকে আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে, ভুল বুঝিয়ে বা পেটের খিদের সুযোগ নিয়ে শরীর থেকে কিছু নেওয়া আইনত দণ্ডনীয় এবং জামিন অযোগ্য অপরাধ।

ক্ষুধার্ত মানুষের চরম দারিদ্র্যকে হাতিয়ার করে গজিয়ে ওঠা এই ‘স্পার্ম মাফিয়া’দের জাল কতদূর বিস্তৃত, তা দেখতে ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে আন্তঃরাজ্য পুলিশ টিম। আহমেদাবাদের কোন কোন বড় ল্যাব এই চক্রের সাথে যুক্ত, তাঁদের লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।