আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিবর্তনের ফলে মানবদেহের নিষ্ক্রিয় অঙ্গগুলিকে ব্যাখ্যা করা বেশ কঠিন। প্রাচীন পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে অভিযোজনের ফলে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে আধুনিক মানুষ এমন অনেক কিছু পেয়েছে আধুনিক বিশ্বে আর কোনও কাজে লাগে না। উদাহরণস্বরূপ, আক্কেল দাঁত একসময় প্রয়োজনীয় ছিল। আদিম যুগে খাদ্যতালিকায় প্রধানত বাদামের মতো শক্ত, কাঁচা খাবার থাকত। তখন খাবার চেবাতে এই আক্কেল দাঁত কাজে লাগত। এখন, এই অতিরিক্ত মাড়ির দাঁতগুলি ভালর চেয়ে বেশি ক্ষতিই করে। তবে, এমন একটি অঙ্গ আছে যার কার্যকারিতা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনও তর্ক করেন। সেটি হল ভোমেরোনাসাল অঙ্গ, বা ‘জ্যাকবসনের অঙ্গ’।

জেকবসনস অর্গান সরীসৃপ, স্তন্যপায়ী এবং উভচর প্রাণীর দেহে থাকে। যা সাধারণত তাদের নাসারন্ধ্রের ভিতরে পাওয়া যায়। এটি অন্য প্রাণীদের দেহ থেকে নিঃসৃত ফেরোমোন ও নির্দিষ্ট রাসায়নিক পদার্থ শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়। মূলত, জেকবসনস অর্গান হল একটি বিশেষভাবে সংবেদনশীল ঘ্রাণযন্ত্রের মতো। যা প্রাণীদের শিকার, শিকারী বা সম্ভাব্য সঙ্গীর রাসায়নিক সংকেত শনাক্ত করার ক্ষমতা দেয়।

কিন্তু আপনি যদি ফেরোমোনসের গন্ধের ওপর ভিত্তি করে দু’জন মানুষের মধ্যে পার্থক্য করতে না পারেন, তবে চিন্তা করবেন না। মানুষের ভোমেরোনাসাল অঙ্গের (VNO) একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে এটি সম্ভবত একটি নিষ্ক্রিয়। সার্জিক্যাল অ্যান্ড রেডিওলজিক অ্যানাটমি-তে প্রকাশিত ২০২৩ সালের একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, “সেপ্টাল সার্জারির সময় VNO-এর ক্ষতি যাতে না হয় তার জন্য বিশেষভাবে সতর্ক থাকার প্রয়োজন নেই।” 
 
এই ধারণাটি অনেকটা অ্যাপেন্ডিক্সের মতো। কিন্তু বর্তমানে অ্যাপেন্ডিক্স সম্পর্কে ধারণা পরিবর্তিত হয়েছে, এবং বিজ্ঞানীরা এখন স্বীকার করেন যে অ্যাপেন্ডিক্স ধারণার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এও হতে পারে যে অ্যাপেন্ডিক্সের মতোই, জ্যাকবসনস অর্গ্যানটি পুরোপুরি অকেজো নয়।

মানুষের শরীরে ভোমেরোনাসাল অর্গান (VNO) আছে কি না, সেই বিতর্কটির অবসান হয়েছে। ব্যবচ্ছেদ, এমআরআই, সিটি স্ক্যান, এন্ডোস্কোপি এবং এমনকি ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপিও মানুষের শরীরে এর অস্তিত্ব মিলেছে। এটি আমাদের নাকের ভিতরে যেখানে তরুণাস্থি এবং হাড় মিলিত হয়, সেখানে অবস্থিত। অ্যানাটমিস্টরা এটিকে একটি ‘অন্ধ থলি’ হিসাবে বর্ণনা করেন। যার অর্থ এর সংবেদী কোষগুলি আমাদের ঘ্রাণতন্ত্রের বাকি অংশের মতোই কাজ করে; নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়া বাতাস যখন VNO-এর উপর দিয়ে যায়, তখন বিশেষ সংবেদী কোষগুলি বায়ুবাহিত রাসায়নিক পদার্থ শনাক্ত করার জন্য ‘নমুনা’ গ্রহণ করে এবং মস্তিষ্কে সেগুলোর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সংকেত পাঠায়। তবে, VNO-এর সেই বিশেষ কোষগুলি নির্দিষ্ট ফেরোমোন শনাক্ত করতে পারে কি না, তা নিয়ে এখনও বিতর্ক রয়েছে।

প্রথমত, সব মানুষের ভোমেরোনাসাল অঙ্গ থাকে না। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে,  মাত্র এক-তৃতীয়াংশ থেকে দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের দেহে এই অঙ্গটি থাকে। এটি শিশু ও তরুণদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এটিই ইঙ্গিত দেয় যে VNO একটি নিষ্ক্রিয় অঙ্গ, কারণ যৌন পরিপক্কতা পর্যন্ত বেঁচে থাকার জন্য এটি স্পষ্টতই অপরিহার্য নয়। এটি না থাকলেও আয়ুষ্কালের উপর কোনও প্রভাব পড়ে না। তা সত্ত্বেও, ‘দ্য কিউরিয়াস জার্নাল অফ মেডিকেল সায়েন্স’-এ ২০১৮ সালের একটি গবেষণায় VNO-র সম্ভাব্য সুবিধার কথা তুলে ধরেছে।

একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে ভোমেরোনাসাল অর্গানের (VNO) ‘রিসেপ্টর কার্যকারিতা’ রয়েছে, যদিও অন্যান্য গবেষণা এই দাবির বিরোধিতা করেছে এবং বলেছে যে মানুষের মধ্যে VNO রিসেপ্টরের জিনগুলি নিষ্ক্রিয় থাকে। চিকিৎসকদের অনেকেই দাবি করেছেন VNO ক্ষতিগ্রস্ত হলে যৌন আচরণ প্রভাবিত হতে পারে। কারণ অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যে এই অঙ্গটি প্রজনন আচরণের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। প্রকৃতপক্ষে, VNO ‘ক্র্যানিয়াল নার্ভ N’-এর সঙ্গে সংযুক্ত। যা হরমোনজনিত কার্যকলাপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব রয়েছে এবং এই বিতর্ক এখনও চলছে।