মেনোপজ অর্থাৎ ঋতুচক্র বা পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়া৷ সাধারণভাবে মনে করা হয়, এই সময়ের পর নারীদের ডিম্বাশয় আর ডিম্বাণু উৎপাদন করে না। এই সময় থেকে নারীর প্রজনন ক্ষমতার কার্যত সমাপ্তি ঘটে। অর্থাৎ মেনোপজের পর গর্ভবতী হওয়ার কোনও সম্ভাবনা থাকে না৷
তবে প্রজনন জীববিজ্ঞানী ফ্রান্সেসকা ডানকান এই প্রচলিত ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁর প্রশ্ন ছিল, ডিম্বাশয় কি সত্যিই মেনোপজের পর সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, নাকি তখনও তার কোনও ভূমিকা থাকে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। তাঁর গবেষণায় উঠে এসেছে, মেনোপজের পর ডিম্বাশয় নিস্ক্রিয় হয় না। বরং তখন সক্রিয় থেকে নতুন একটি দায়িত্ব গ্রহণ করে।
বর্তমানে মানুষের গড় আয়ু আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। ফলে মেনোপজ-পরবর্তী জীবনও দীর্ঘ হচ্ছে। অথচ এই সময় শরীরে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে, সে সম্পর্কে এখনও অনেক কিছুই অজানা।
ডানকান ২৮ জন মেনোপজ-পরবর্তী নারীর ডিম্বাশয়ের টিস্যু নিয়ে একটি গবেষণা করেছিলেন। সেই গবেষণায় দেখা যায়, বিভিন্ন বয়সের নারীদের ডিম্বাশয়ের টিস্যু থেকে উৎপন্ন প্রোটিনের ধরনে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। যদি ডিম্বাশয় সত্যিই নিষ্ক্রিয় হয়ে যেত, তাহলে এমন পার্থক্য থাকার কথা নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি-র গবেষক ফ্রান্সেসকা ডানকান এবং তাঁর সহকর্মীদের একটি নতুন গবেষণা সম্প্রতি Molecular Human Reproduction জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে ইঁদুরের উপর পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা গেছে, মেনোপজ-পরবর্তী ডিম্বাশয় মোটেও নিষ্ক্রিয় নয়। ইঁদুরের গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ২ মাস, ১৮ মাস এবং ২৪ মাস বয়সি ইঁদুরের ডিম্বাশয় সংগ্রহ করেন। এই বয়সগুলি ইঁদুরের প্রজনন জীবনের বিভিন্ন ধাপকে নির্দেশ করে। একটি ডিম্বাশয়ের টিস্যু অণুবীক্ষণ যন্ত্রে পরীক্ষা করা হয় এবং অন্যটি RNA sequencing প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়, যাতে বোঝা যায় কোন কোন জিন এখনও সক্রিয়ভাবে প্রোটিন তৈরি করছে।
স্বাভাবিকভাবেই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রজনন-সংক্রান্ত কার্যকলাপ কমে যায়। বয়স্ক ইঁদুরের ডিম্বাশয়ে ফলিকলের সংখ্যা কমে যায় এবং কোষ ও কোলাজেনের গঠনেও পরিবর্তন দেখা যায়। তবে গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হল, ডিম্বাশয়ের কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয় না। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি নতুন ভূমিকা নিতে শুরু করে।
গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বয়স্ক ডিম্বাশয়ে টি-সেল, ম্যাক্রোফেজ এবং মাল্টিনিউক্লিয়েটেড জায়ান্ট সেল-এর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। অর্থাৎ ডিম্বাশয় ধীরে ধীরে এক ধরনের রোগপ্রতিরোধ ও প্রদাহ-সম্পর্কিত অঙ্গের বৈশিষ্ট্য অর্জন করে।
গবেষকদের মতে, এই ফলাফল দীর্ঘদিনের সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে যে মেনোপজের পর ডিম্বাশয় সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। বরং এটি নতুন ধরনের জৈবিক পরিচয় গ্রহণ করে, যা হরমোন, কোষের পারস্পরিক যোগাযোগ এবং শরীরের সামগ্রিক বার্ধক্য প্রক্রিয়ার উপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে মেনোপজ-পরবর্তী স্বাস্থ্য এবং যাঁদের অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ডিম্বাশয় অপসারণ করা হয়েছে, তাঁদের চিকিৎসা ও যত্নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।















