“মধু আজকাল আর আগের মতো হয় না”, মৌমাছি-পালনকারী ব্যক্তিদের এই দীর্ঘশ্বাস এখন গোটা বিশ্ব জুড়ে। আমেরিকা থেকে ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা থেকে এশিয়া— সর্বত্রই কমছে মধু উৎপাদন।
মধু শুধু একটি সুস্বাদু স্বাস্থ্যকর খাবার নয়, এই সংকট আসলে বিশ্বের খাদ্য-নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কারণ পৃথিবীর প্রায় ৭৫% প্রধান খাদ্যশস্য নির্ভর করে পরাগায়নের উপর, এবং মৌমাছি সেই কাজের প্রধান কারিগর।
পেন স্টেট ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ১৯৯০-এর দশক থেকেই মধু উৎপাদনে ঘাটতি দেখা গিয়েছে৷ ১৯৯২ সালের পর থেকে এই পতনের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি যোগ স্পষ্ট হয়েছে।
কেন কমছে মধু?
ফুলের সংখ্যা কমে যাওয়া: মৌমাছিদের মধু তৈরির কাঁচামাল— ফুলের পরাগ ও মধুরস। যত বেশি ফুল, তত বেশি মধু। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, খরা, অতিরিক্ত বৃষ্টি, এই সব কারণে ফুল ফোটার সময় ও পরিমাণ বদলে দিচ্ছে।
কীটনাশকের ব্যবহার: কৃষিতে রাসায়নিকের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে৷ বিশেষত গ্লাইফোসেট-এর মতো হার্বিসাইড— বুনো ফুল ধ্বংস করছে। শুধু কীটনাশক সরাসরি মৌমাছির শরীরে প্রবেশ করে তাদের রোগপ্রতিরোধ ও প্রজনন-ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
ভূমি-ব্যবহারে পরিবর্তন: আগে যেখানে পতিত জমিতে বুনো ফুল ফুটত, সেগুলো এখন বাণিজ্যিক চাষজমিতে পরিণত হয়েছে।
মাটির উৎপাদনক্ষমতা: গবেষণায় দেখা গেছে— মাটির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈব গুণমান এবং জলবায়ু— এই দু’টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক মধু উৎপাদনে।
প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ১৮ লক্ষ টন মধু উৎপাদিত হয়— এর হ্রাস মানে বিশ্বের খাদ্যশৃঙ্খলেই ফাটল।
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মধু-উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ। সুন্দরবনের মৌয়ালদের ঐতিহ্যবাহী মধু-আহরণ বাংলার গর্ব। কিন্তু এখানেও মধু উৎপাদন কমছে— ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা, আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা, ম্যানগ্রোভ-ধ্বংস— সব মিলিয়ে মৌমাছি ও মৌয়াল উভয়ই বিপন্ন।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, পরাগায়ক-বান্ধব কৃষি চালু করা, কীটনাশকের নির্বিচার ব্যবহার বন্ধ, বাড়িতে ফুলের বাগান, রাসায়নিক-মুক্ত শহুরে পার্ক, এবং ছোট আকারের শহুরে মৌমাছি-পালন -কে উৎসাহ দেওয়া।















