আজকাল ওয়েবডেস্ক: রোগা হওয়ার হুজুগ এখন ঘরে ঘরে। মেদ ঝরিয়ে ছিপছিপে হওয়ার লড়াইয়ে সামিল প্রায় সকলেই। কিন্তু চিকিৎসকেরা বলছেন, এই অতিরিক্ত রোগা হওয়ার নেশাই ডেকে আনতে পারে চরম বিপদ। বিশেষ করে সন্তানধারণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা যেমন অন্তরায়, শরীরের ওজন প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়াও কিন্তু সমান ক্ষতিকর। অনেক সময় এই বিপত্তি ঘটে নিঃশব্দে, যা টের পেতেও দেরি হয়ে যায়।
চিকিৎসকদের মতে, যদি কোনও মহিলার 'বডি মাস ইনডেক্স' বা বিএমআই ১৮.৫-এর নিচে থাকে, তবে তাঁর মা হওয়ার পথে নানা বাধা আসতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-র নিয়ম অনুযায়ী, ১৮.৫-এর কম বিএমআই মানেই সেই ব্যক্তি 'আন্ডারওয়েট' বা অপুষ্টির শিকার। এর ফলে শরীরে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, অনিয়মিত হয়ে পড়ে ঋতুচক্র এবং গর্ভাবস্থায় তৈরি হয় নানা জটিলতা।
বেঙ্গালুরুর বন্ধ্যত্ব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অনুপমা অশোকের কথায়, "প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য শরীরে একটা নির্দিষ্ট মাত্রার শক্তির সঞ্চয় থাকা জরুরি। শরীরের ফ্যাট যখন একটি সীমার নিচে নেমে যায়, তখন মস্তিষ্ক মনে করে শরীরে শক্তির আকাল দেখা দিয়েছে।"
মস্তিষ্কের ‘হাইপোথ্যালামাস’ নামক অংশটি শরীরের প্রজনন ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে। যখন ওজন খুব কমে যায়, তখন এই অংশটি ঠিকমতো কাজ করে না। ফলে ডিম্বাণু তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় হরমোন নিঃসরণ থমকে যায়। একে চিকিৎসবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ফাংশনাল হাইপোথ্যালামিক অ্যামেনোরিয়া’ বা এফএইচএ। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মেয়েদের পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যাওয়ার অন্যতম বড় কারণ এটি।
এখানে মূল চাবিকাঠি হল ‘লেপটিন’ হরমোন। এটি মূলত শরীরের ফ্যাট থেকে তৈরি হয়। ডঃ অশোকের ব্যাখ্যায়, "লেপটিন হল প্রজনন ব্যবস্থার সবুজ সংকেত। ফ্যাট কমলে লেপটিনও কমে যায়, আর তখনই সবুজ সংকেত বদলে যায় লাল সংকেতে। মস্তিষ্ক ধরে নেয়, শরীর এই মুহূর্তে সন্তান ধারণের উপযুক্ত নয়।"
বন্ধ্যত্বের আলোচনা সাধারণত মহিলাদের ঘিরেই আবর্তিত হয়। কিন্তু চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, পুরুষদের ক্ষেত্রেও কম ওজন সমান সমস্যার। ওজন খুব কমে গেলে পুরুষদের শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোন ও শুক্রাণুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক ভাবে কমে যেতে পারে। কারণ, শরীর তখন নতুন প্রাণ সৃষ্টির বদলে নিজের বেঁচে থাকার রসদ জোগাতেই ব্যস্ত থাকে।
কম ওজন নিয়ে গর্ভধারণ করলেও ঝুঁকি পিছু ছাড়ে না। আইসিএমআর-এর তথ্য বলছে, মায়ের শরীরে পর্যাপ্ত পুষ্টি না থাকলে সময়ের আগে শিশুর জন্ম বা কম ওজনের শিশু জন্মানোর সম্ভাবনা প্রবল থাকে।
চিকিৎসকদের মতে, সন্তানধারণের জন্য কৃত্রিম উপায়ে ওজন বাড়ানো সমাধান নয়। বরং দরকার স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা। ডঃ অশোকের পরামর্শ, "জাঙ্ক ফুড খেয়ে ওজন বাড়ানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ডায়েটে রাখতে হবে পুষ্টিকর ফ্যাট যেমন বাদাম, অ্যাভোকাডো এবং ভালো মানের তেল। সেই সঙ্গে খুব কড়া ব্যায়াম কমিয়ে পেশি তৈরির দিকে নজর দিতে হবে।"
আধুনিক সৌন্দর্যের মাপকাঠি যাই হোক না কেন, চিকিৎসকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে উর্বরতা আসলে শরীরের সচ্ছলতার লক্ষণ। শরীর যখন নিজেকে পুষ্ট এবং নিরাপদ মনে করে, তখনই সে নতুন প্রাণ তৈরির জন্য প্রস্তুত হয়। তাই ওজনের কাঁটা নিচে নামানোর চেয়ে হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখাই মা হওয়ার প্রধান শর্ত।
