পায়ের তলায় সর্ষে? ক্লিশে। বেড়ানোর খিদে আসলে বাঙালির শিরায় শিরায় বয়। উত্তরাধিকার সূত্রে ছড়ায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। সাধ-সাধ্যের যুগলবন্দিতে ভ্রমণের ধরন থেকে ধারা, সবই বদলে যায় যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। তৈরি হয় নতুন নতুন ট্রেন্ড। ঠিক যেমন, এখন বেড়ানোর সংজ্ঞা নতুন করে লিখছে জেন-জি। আর তাদের হাত ধরেই চলতি হাওয়ায় নাম লেখাচ্ছে ভ্রমণের হরেক রকম ধরন। আগেকার মতো স্রেফ জনপ্রিয় গন্তব্যে যাওয়া নয়। ট্র্যাভেল ভ্লগ বা ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের অফবিট লোকেশন বা হিডেন জেমের চেনা হাতছানিও নয়। তার বাইরে গিয়েও কিন্তু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে সফরের নতুন রকম স্বাদ।
তবে শুধু জেন-জি কেন? বেড়াতে তো ভালবাসেন সব বয়সেরই মানুষ। নতুন প্রজন্মের তৈরি করে দেওয়া এসব ট্রেন্ড মনে ধরলে বাকিদেরই বা গা ভাসাতে ক্ষতি কী? কিন্তু তার আগে তো জানতে হবে, কী কী ধরনের নতুন ভ্রমণ-ভাবনায় মেতে উঠছে জেন জি! আসুন, তারই হালহদিশ করা যাক তবে।
মাইক্রোকেশন – বেড়ানোর মেয়াদ ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা। মানে, সাধারণ সপ্তাহান্ত, লং উইকেন্ড, মাঝ-সপ্তাহের হঠাৎ ছুটি কিংবা আহ্লাদে নেওয়া ক্যাজুয়াল লিভ— টুক করে বেরিয়ে পড়লেই হল। লক্ষ্য একটাই, ব্যস্ত রুটিনের ফাঁকে একটু অক্সিজেন।
রুম রটিং – বেড়াতে যাচ্ছেন, তবে ঠিক বেড়াতে নয়। আসলে যাচ্ছেন বাড়ি থেকে দূরে হোটেল, রিজর্ট, বা হোমস্টে-তে একটু হাত-পা ছড়িয়ে আরাম করতে। বারান্দায় বসে সূর্যোদয়, আয়েশ করে চায়ে চুমুক, ঘরেই জমিয়ে আড্ডা আর রুম-সার্ভিসে খাওয়াদাওয়া। ব্যস! গন্তব্য যেখানেই হোক। মানে, যাকে বলে স্রেফ ঘরের স্বাদবদল।
ডি-ইনফ্লুয়েন্সড ট্র্যাভেল – সোশ্যাল মিডিয়ায়, জনপ্রিয় ভ্লগে সে জায়গার নামগন্ধ নেই। ফলে ইনফ্লুয়েন্সারদের দেখানো পথ ধরা ভিড়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার ভয়ও নেই তেমন। স্রেফ আপনার পছন্দের ঠিকানা এবং আপনি। সেটাই আপনার ছুটির স্বাদ।
মিরর ট্রিপ – ভ্রমণের ঠিকানা হিসেবে তার জনপ্রিয়তা কেমন, তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই। কিন্তু সেখানে গেলে আপনি খুঁজে পাবেন নিজেকে, নিজের ভাললাগাগুলোকে। এমন জায়গা বেছে বেড়াতে যাওয়া যেন নিজের পছন্দে আয়না ধরার মতোই।
হোয়াইকেশন- বেড়াতে যাওয়া নয়, বরং উত্তর খোঁজাই এ ভ্রমণের উদ্দেশ্য। প্র্চণ্ড মানসিক চাপে দিন কাটছে কিংবা আস্ত জীবনটাই যেন গোলকধাঁধার মতো হয়ে গিয়েছে। একটুকরো শান্তি কিংবা মনের ভিতর ঘুরপাক খাওয়া নানা রকম চিন্তা-সংশয়ের উত্তর খুঁজতে টুক করে কোথাও থেকে ঘুরে আসা। একা, দোকা নাকি সদলে— সে আপনার ইচ্ছে।
লোকাল লোর হান্টিং – পর্যটক হয়ে কোথাও বেড়াতে যাওয়া নয়। বরং চেনা বা অচেনা জায়গায় গিয়ে পথঘাট, হাটে-মাঠে হেঁটে, সেখানকার নিজস্ব খাবার চেখে, এলাকার পরবে যোগ দিয়ে, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে গল্প করে তাঁদের মতো করেই কাটিয়ে আসা কয়েকটা দিন। তার স্বাদ একেবারে আলাদা কিন্তু!
মেন্টি বি ট্র্যাভেল – ভ্রমণ নয়, এ আসলে শ্বাস নেওয়া। হয়তো ভয়ানক কাজের চাপে কেটেছে বেশ কিছু দিন। কিংবা সদ্য পার করেছেন জীবনের ভীষণ কঠিন একটা সময়। এখনও মাথার মধ্যে তার রেশ। তার থেকে ছুটি পেতেই ছুট। যেখানে খুশি। এই ব্রেকটাই আপনাকে আবার নতুন করে নিঃশ্বাস নিয়ে বাঁচতে শেখাবে।
সাইড কোয়েস্টিং – এক সময়ে বাঙালি বছরে একবার বা দু’বার বেড়াতে যেত। বছরভর টাকা জমিয়ে লম্বা ছুটি। সেই ভাবনা থেকেই একেবারে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে বছরভর ছোট্ট ছোট্ট ছুটিতে টুক করে বেরিয়ে পড়া। একটা ছুটির স্মৃতির বদলে ঝুলিতে টুকরো টুকরো একগাদা গল্প। কী, কেমন প্ল্যান?
অ্যান্টি-আইটিনেরারি ট্রিপ – আজ যাঁরা প্রবীণ কিংবা মধ্যবয়সের মধ্যগগনে, তাঁদের বেড়ানো বরাবরই ছিল প্ল্যান-নির্ভর। মানে কী ভাবে যাবেন, কী কী করবেন, কোথায় কোথায় এবং কীসে ঘুরবেন, কোথায় কী খাবেন বা কোথায় কী দেখবেন— সব আগেভাগে ছকে রাখা। গন্তব্যে পৌঁছে লিস্ট মিলিয়ে সব করাটাই ছুটির আনন্দ। সে ভাবনাটাই ভেঙে বেরোনোর পালা। মানে কোথাও একটা পৌঁছে যাওয়াটুকু প্ল্যানে আছে শুধু। তারপর বাকিটা? যখন, যেমন, যা যা ইচ্ছে হবে!
ড্রাই ট্রিপিং – জমজমাট সোশ্যাল আউটিং নয়। নাইটলাইফে মাতোয়ারা হওয়াও নয়। স্রেফ প্রকৃতির মাঝে ছুটি কাটানো। বই পড়া, ছবি আঁকা, ছবি তোলা, লেখালেখি বা ক্যাম্পিং বা হাইকিংয়ের মতো পছন্দের কাজ আর ইচ্ছেমতো বিশ্রাম। আলসে আরামে মন্দ কাটবে না মনে হয়!
হোক না জেন জি-র ট্রেন্ড, ছুটির স্বাদগন্ধ কবেই বা বয়সের তোয়াক্কা করেছে! সে আপনি একুশ হোন আর একাত্তর, ভাবনাটা মনের মতো হলে বেরিয়ে পড়লেই তো হল।
















