নারীদের সুস্থতার অন্যতম মূল স্তম্ভ হল সঠিক পুষ্টি। নারীদের শারীরবৃত্তীয় গঠন অত্যন্ত জটিল। হরমোনের ভারসাম্য, প্রজনন স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে বিপাকক্রিয়া পর্যন্ত নানা বিষয়ের উপরই এর প্রভাব পড়ে। পর্যাপ্ত পুষ্টি শরীরকে প্রয়োজনীয় শক্তি জোগায়, হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা নিশ্চিত করে।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সংসারের কাজ, অফিসের চাপ কিংবা দু’য়ের ভারসাম্য রাখতে গিয়ে বহু নারীই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণের ঘাটতিতে ভোগেন। দীর্ঘদিন ধরে এই ঘাটতি চলতে থাকলে তা ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পুষ্টিহীনতা আপনাকে নানাভাবে দুর্বল করে তুলতে পারে। প্যাথোলজিস্ট ও হেমাটোপ্যাথোলজিস্ট ডা. কমলেশ প্রজাপতির মতে, এমন তিনটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান রয়েছে, যেগুলির অভাবে শরীরের শক্তি কমে যায়, হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক সুস্থতা বিঘ্নিত হয়।
ডা. প্রজাপতি বলেন, “সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, এই ঘাটতির লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। অনেক সময় যখন তা বোঝা যায়, তখন দৈনন্দিন জীবন ইতিমধ্যেই প্রভাবিত হতে শুরু করে।” অর্থাৎ, শুরুতে চোখে পড়ার মতো কোনও উপসর্গ না থাকলেও ভিতরে সমস্যা বাড়তে থাকে। যার প্রভাব পড়ে শক্তি, মনোযোগ এবং হরমোনের উপর।
যে তিনটি পুষ্টি উপাদান নারীদের শরীরে অত্যন্ত জরুরি
আয়রন
আয়রনের ঘাটতি হলে মাথা ঘোরা, ক্লান্তি বা দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। ডা. প্রজাপতি জানান, “আয়রন হিমোগ্লোবিন তৈরিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হিমোগ্লোবিনই রক্তে অক্সিজেন বহন করে। তাই আয়রনের অভাবে অতিরিক্ত ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, কাজের ক্ষমতা কমে যাওয়া কিংবা ঘন ঘন সংক্রমণ হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, অনিয়মিত ঋতুস্রাব, গর্ভাবস্থা এবং সন্তান জন্মের পর নারীরা আয়রনের ঘাটতির ঝুঁকিতে বেশি থাকেন। চুল পড়া, ত্বক ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া কিংবা সব সময় ক্লান্ত লাগাও এর লক্ষণ হতে পারে। ডা. প্রজাপতির কথায়, আয়রন শক্তি, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং শরীরের সামগ্রিক কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
আয়রনসমৃদ্ধ খাবার: পালং শাক, ডাল, ছোলা, মিলেটস, বাদাম ও বীজ, গুড়, খেজুর, রেড মিট, ডিমের কুসুম।
আয়রন শোষণ আরও ভাল করতে তিনি ভিটামিন সি–সমৃদ্ধ খাবার যেমন লেবু, আমলকি বা টমেটো খাওয়ার পরামর্শ দেন।
ভিটামিন বি১২
ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতিও নারীদের মধ্যে খুবই সাধারণ, বিশেষ করে যাঁরা নিরামিষ বা ভেগান খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করেন। ডা. প্রজাপতির কথায়, “ভিটামিন বি১২ স্নায়ুকে সুস্থ রাখে, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায় এবং লোহিত রক্তকণিকা ও ডিএনএ তৈরিতে সাহায্য করে।”
ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতির লক্ষণ: দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, হাত বা পায়ে ঝিনঝিনি ভাব, মনোযোগের অভাব, মুড পরিবর্তন।
ভিটামিন বি১২-এর উৎস: দুধ, দই, পনির, চিজ, ডিম, মাছ, মাংস।
ফোলেট
ফোলেট বা ভিটামিন বি৯, নারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভধারণের আগে ও গর্ভাবস্থায় এটি কোষের বৃদ্ধি ও মেরামতে সাহায্য করে এবং ভ্রূণের সঠিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ডা. প্রজাপতি জানান, পর্যাপ্ত ফোলেট জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে এবং রক্ত ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখে। ফোলেটের ঘাটতি হলে রক্তাল্পতা, দুর্বলতা ও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ফোলেট সমৃদ্ধ খাবার: গাঢ় সবুজ শাকসবজি, ব্রকোলি, অ্যাসপারাগাস, অ্যাভোকাডো, সাইট্রাস ফল, চিনাবাদাম, ডাল, গোটা শস্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় এই প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানগুলির ঘাটতি পূরণ করলেই নারীরা সুস্থ ও কর্মক্ষম জীবনযাপন করতে পারবেন।
