সকালে ঘুম থেকেই উঠে হাতে ফোনে, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগেও স্ক্রিনে চোখ। ব্যক্তিগত হোক কিংবা পেশাগত, দিনভর অসংখ্য নোটিফিকেশন, অনবরত স্ক্রলিং আর ভার্চুয়াল জগতের খুঁটিনাটিতে বিচরণ। যা  অজান্তে কখন যেন শরীর-মনের ওপর অদৃশ্য চাপ তৈরি করতে থাকে, ক্রমশ আষ্ঠেপৃষ্ঠে গ্রাস করে মানবজীবন। একথা ঠিক যে এখন ডিজিটাল দুনিয়ায় যুক্ত হওয়া কাজের জগতে চাহিদাও বটে! কিন্তু প্রযুক্তি নির্ভরতা আসক্তিতে পরিণত হলেই বিপদ! তখনই প্রয়োজন ‘ডিজিটাল ডিটক্স’। সঠিক উপায় জানা থাকলে ডিজিটাল দুনিয়ার বেড়াজাল থেকে সহজেই মুক্তি মিলবে। সেবিষয়ে পরামর্শ দিলেন বিশিষ্ট সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ দেবাঞ্জন পান।


কখন প্রয়োজন

* ফোনের ব্যাটারি শেষ হয়ে গেলে, নেট না থাকলে বা ফোন দূরে থাকলে অকারণে উদ্বেগ তৈরি হয়? এককথায় ফোন যদি মানসিক নিরাপত্তার আশ্রয় হয়ে ওঠে তাহলে না বিপদ সংকেত।

* কোনও লেখা পড়তে বসে বারবার ফোন চেক করা, কারও কথা শুনতে শুনতে নোটিফিকেশন দেখার তাগিদ—এই অভ্যাসগুলো বলে দেয় আপনার মন স্ক্রিনের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

* সময় হারানো ডিজিটাল আসক্তির সবচেয়ে নীরব লক্ষণ। মাত্র পাঁচ মিনিট রিল দেখতে গিয়ে আধঘণ্টা কেটে যাওয়া- এই অভিজ্ঞতা খুব পরিচিত হলে সতর্ক হওয়া জরুরি। 

* ঘুমানোর আগে স্ক্রল করা, মাঝরাতে নোটিফিকেশন দেখে ঘুম ভেঙে যাওয়া—এই সবই বুঝিয়ে দেয় আপনার ডিজিটাল ডিটক্স প্রয়োজন।

*  সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের ‘পারফেক্ট’ জীবন দেখে নিজের জীবনকে ফিকে লাগে? আপাতভাবে সাধারণ বিপজ্জনক অভ্যাস। 

* একই ঘরে বসেও কথা কমে যাওয়া, আড্ডার মাঝখানে ফোন ঢুকে পড়া-এই লক্ষণগুলো সম্পর্কের উপর ডিজিটাল চাপের ইঙ্গিত দেয়।

* অকারণে রেগে যাওয়া, ধৈর্য কমে যাওয়া, চুপচাপ বসে থাকতে না পারা-এইসব আচরণও অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের ফল হতে পারে।


ডিটক্সের ধরন বুঝে ভিন্ন পদক্ষেপ 

ডিজিটাল ডিটক্স মূলত তিন ধরনের হতে পারে। সম্পূর্ণ, আংশিক ও সিলেক্টিভ। 


সম্পূর্ণ ডিজিটাল ডিটক্স হল সমস্ত ডিজিটাল ডিভাইস থেকে নিজেকে দূরে রাখা। মোবাইল, কম্পিউটার, ইন্টারনেট-সবকিছুরই বিরতি। এই ধরনের ডিটক্স সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং। এতে দৈনন্দিন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই এমন সিদ্ধান্ত নিলে যাতে পরিবার-পরিজনদের আগে থেকেই জানিয়ে রাখা জরুরি। 


আংশিক ডিজিটাল ডিটক্সে কিছুটা ছাড় থাকে। মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহার সীমিত করা হয়, তবে নেটফ্লিক্স বা ইউটিউবের মতো প্যাসিভ মিডিয়া দেখা যেতে পারে। এই পদ্ধতি দেখতে কঠিন মনে না হলেও আসলে মোটেই সহজ নয়। নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


সিলেক্টিভ ডিটক্স তুলনামূলকভাবে সহজ। এক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া, হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুকের মতো অ্যাপ থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়া হয়। নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, অ্যাপ স্লিপ মোডে দেওয়া-এই ছোট পদক্ষেপেই অনেকটা মানসিক স্বস্তি পাওয়া যায়।


সময় ধরে ডিটক্স: ডিজিটাল ডিটক্স করার সিদ্ধান্ত নিলে তা সময় ধরে মেনে চলার চেষ্টা করুন। নিজের কাজ, দায়িত্ব ও মানসিক প্রস্তুতি অনুযায়ী সময় বেছে নেওয়া জরুরি। সেক্ষেত্রে যে গাইডলাইন মানতে পারেন তা হল- প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে, সপ্তাহে পাঁচ দিন। সপ্তাহে দু’দিন চার ঘণ্টা করে, মাসে দু’বার ২৪ ঘণ্টা কিংবা মাসে একবার ৪৮ ঘণ্টা। 


মানসিক প্রস্তুতি: ডিজিটাল ডিটক্স করতে গিয়ে অনেকেই এক ধরনের ‘উইথড্রয়াল’ অনুভব করেন। অস্থিরতা, রাগ, অকারণ চিন্তা, বুক ধড়ফড়, ঘুমের সমস্যা—এসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে। আসলে ডিজিটাল আসক্তি অনেক ক্ষেত্রে নেশার মতোই মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে। এই সময় আপনার নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে এমন কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়া প্রয়োজন। একা না করে দলবদ্ধভাবে ডিটক্স করলে সাফল্যের সম্ভাবনা বেশি থাকে। 


শরীরকে কাজে লাগালে শান্ত হবে মন: ডিজিটাল ডিটক্সের সময় স্ট্রেস কাটানোর সবচেয়ে ভাল উপায় হল শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা। সাইক্লিং, দৌড়ানো, নাচ, যোগা, ওয়েট ট্রেনিং, ইনডোর স্পোর্টস বা হাইকিং-যা ভাল লাগে তাই করুন। আরামদায়ক জুতো, পোশাক ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আগে থেকে জোগাড় করে রাখলে নিয়ম বজায় রাখা সহজ হবে।


স্ত্রিন ছাড়া সৃজনশীলতা: নাচ, জার্নাল লেখা, রান্না, সেলাই, ছবি আঁকার মতো সৃজনশীল কাজ মনকে অনেকটাই স্থির রাখে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, এই কাজগুলো যেন আবার মোবাইল বা গ্যাজেটের উপর নির্ভরশীল না হয়ে পড়ে।


ভার্চুয়াল নয়, বাস্তবে সামাজিকতা: আজকাল সমাজমাধ্যমে বহু মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বাস্তবে ডিজিটাল নির্ভরতা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দিচ্ছে। তাই ডিজিটাল ডিটক্সের দিনে বন্ধু, প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটান। সপ্তাহে অন্তত একটা দিন সামাজিকভাবে যুক্ত থাকার অভ্যাস গড়ে তুলুন। 


রিল্যাক্সেশনেই রিসেট: মেডিটেশন, মাইন্ডফুলনেস, ডিপ ব্রিদিং, প্রগ্রেসিভ মাসল রিল্যাক্সেশন-এসব পদ্ধতি ডিটক্সের সময়ে ভীষণ কাজে দেয়। প্রয়োজনে পেশাদার প্রশিক্ষকের সাহায্য নিতে পারেন। নিজে গান করা কিংবা মোবাইলে আগে থেকে ডাউনলোড করে গান শুনতে পারেন। ডিটক্সের নির্দিষ্ট দিন তো বটেই, দৈনন্দিন চর্চাতেও এই জীবনযাপন জরুরি।


নিজেকে গড়ার সময়: ওয়ার্কশপ, বই পড়া, গল্প বলার আসর, ছবির প্রদর্শনী-এই ধরনের পার্সোনাল গ্রোথ ও শিক্ষামূলক কাজ ডিজিটাল ডিটক্সে সাহায্য করে। 


সংস্কৃতিতে মন ভরুক: ডিজিটাল দুনিয়া থেকে দূরত্ব বাড়াতে সাংস্কৃতিকভাবে বিনোদনের জায়গা খুঁজে নিতে হবে। যেমন ধরুন আপনি যদি কলকাতায় থাকেন তাহলে এই শহরের মিউজিয়াম, ঐতিহাসিক জায়গা, থিয়েটার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান-এসবের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন।  


সবুজে স্বস্তি: সবুজের মধ্যে থাকলে শান্ত হয় মন। গাছে জল দেওয়া, বাড়ির ছাদে কিংবা আশেপাশের পার্কে অলসভাবে বসে পাখি দেখার অভ্যাস, পোষ্যর সঙ্গে সময় কাটানো-এই সব ছোট ছোট অভ্যাসই মনে গভীর প্রভাব ফেলে।