আজকাল ওয়েবডেস্ক: আজকের সমাজে এখনও যৌনতা ও যৌন স্বাস্থ্যের আলোচনাকে অনেকাংশেই নিষিদ্ধ, লজ্জাজনক ও অনুপযুক্ত বলে মনে করা হয়। কিন্তু হাজার হাজার বছর ধরে আয়ুর্বেদ এই বিষয়ে এক গভীর ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এসেছে। আয়ুর্বেদ মতে, যৌনতা মানবদেহের তিনটি মূল স্তম্ভের একটি, যা শরীরকে পুষ্ট করে, দোষগুলিকে সুষম রাখে এবং সামগ্রিক সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক। আয়ুর্বেদ অনুযায়ী, যৌনতা কেবলমাত্র আনন্দ বা প্রজননের সীমায় আবদ্ধ নয়। এটি শুক্রধাতুর মাধ্যমে শরীরের একটি মৌলিক গঠনকারী উপাদান হিসেবেও বিবেচিত হয়। শুক্রধাতু অর্থাৎ শুক্র সম্পর্কিত যা কিছু, যেমন পুরুষের ক্ষেত্রে বীর্য বা শুক্রাণু এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে ডিম্বাণু—এইসব কিছু আয়ুর্বেদের সাতটি ধাতুর মধ্যে অন্যতম। অন্য ধাতুগুলির মধ্যে রয়েছে রস (প্লাজমা), রক্ত , মাংস (পেশি), মেদ (চর্বি), অস্থি (হাড়), ও মজ্জা (হাড়ের মজ্জা)।

একটি সুস্থ এবং সুষম শুক্রধাতু শরীরের সার্বিক স্বাস্থ্য ও শক্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে। শুক্রধাতুর আধিক্য অতিরিক্ত কামপ্রবণতা তৈরি করতে পারে, আবার অপর্যাপ্ত শুক্রধাতু দুর্বলতা, নপুংসকতা এবং বন্ধ্যাত্বের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। ওজস নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী, সেটিও যৌন আচরণের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ, যৌনতা সরাসরি আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও প্রাণশক্তিকে প্রভাবিত করে। আয়ুর্বেদ মতে, যৌনতার সেরা সময় শীতকাল ও বসন্তকাল। এই সময়ে কফ দোষ প্রবল থাকে, যা জলের উপাদানে সমৃদ্ধ এবং শুক্র উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে। এই সময় গর্ভধারণের সম্ভাবনাও বেশি থাকে। অপরদিকে, গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে যৌন আকাঙ্ক্ষা ও শুক্র উৎপাদন কমে যায়, কারণ এই সময়ে পিত্ত ও বাত দোষ বৃদ্ধি পায়, যা শরীরকে দুর্বল করে তোলে।

আরও পড়ুন: রাতের আদরে অনিহা স্ত্রী'র? এই কাজগুলো করলেই ঝড় উঠবে বিছানায়

এমনকি যৌনমিলনের সময় নিয়েও আয়ুর্বেদের নিজস্ব নির্দেশিকা রয়েছে। দিনের বেলায়, সূর্যোদয়ের পর কিন্তু সকাল ১০টার মধ্যে যৌনমিলন শ্রেয়। সন্ধ্যাবেলাও যৌনতা গ্রহণযোগ্য হলেও, রাতে তা একেবারেই অনুপযুক্ত বলে মনে করা হয়। কারণ, রাতে শরীর বিশ্রামের জন্য তৈরি হয়, এবং অতিরিক্ত যৌনমিলন এই ভারসাম্যকে বিঘ্নিত করতে পারে। যদি কেউ অপ্রচলিত সময় বা ঋতুতে যৌনমিলনে লিপ্ত হন, তবে আয়ুর্বেদ অনুযায়ী তাঁদের রসায়ন ও টনিক গ্রহণ করে শরীরকে পুনরায় সুষম করতে হবে। প্রাচীন আয়ুর্বেদিক গ্রন্থ 'অষ্টাঙ্গ হৃদয়ম্'-এ আয়ুর্বেদাচার্য বাগভট বলেছেন, শীতকালে প্রতিদিন যৌনমিলন করা যেতে পারে, তবে তার আগে বীর্যবর্ধক ঔষধ ও শরীরের শক্তি অর্জন আবশ্যক। বসন্ত ও শরৎকালে তিন দিনে একবার যৌনমিলন উপযোগী, আর গ্রীষ্ম ও বর্ষায় প্রতি দুই সপ্তাহে একবার যৌনমিলনই যথেষ্ট।

এই নিয়মগুলি "সমতা বাড়ায়, বৈপরীত্য হ্রাস করে" এই নীতির উপর ভিত্তি করে গঠিত। অর্থাৎ ঋতুর প্রকৃতি অনুসারে যৌন আচরণে সামঞ্জস্য আনা উচিত। শরীর যখন শক্তিশালী (শীতকাল), তখন যৌনমিলনের ক্ষমতা ও ইচ্ছা স্বাভাবিকভাবেই বেশি হয়। গ্রীষ্মকালে, শরীরের শক্তি সবচেয়ে কম থাকে, তাই তখন যৌনমিলন কমিয়ে দেওয়া ভালো। আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ আয়ুর্বেদিক পরামর্শ রয়েছে যৌনস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য। যেমন—যৌনমিলনের পর শরীরে তেল মালিশ করে স্নান করা উচিত, যাতে শুক্রধাতু ক্ষয়ের ফলে যে বাত দোষ বাড়ে তা প্রশমিত হয়। খাদ্যাভ্যাসে গরু দুধ, নারকেল জল ও ঘি রাখা উচিত, কারণ এগুলি প্রাকৃতিক বীর্যবর্ধক। এছাড়া পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও সুষম খাদ্য গ্রহণ, মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখা এবং ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যৌন অভ্যাস বজায় রাখাই আয়ুর্বেদের যৌনজীবন সম্পর্কিত মূল শিক্ষা।

আজকের দিনে যখন যৌনতা নিয়ে কথা বলাটাই অনেকের কাছে নিষিদ্ধ ও অশোভন বলে বিবেচিত হয়, তখন আয়ুর্বেদ এক পরিপূর্ণ, স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক এবং বৈজ্ঞানিক পরিপ্রেক্ষিত হাজির করছে, যেখানে যৌনতা শুধুমাত্র কামনাবাসনার বিষয় নয়, বরং শরীর ও মনের সুস্থতার একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যৌনতাকে স্বাস্থ্য ও ঋতুর চক্রের সঙ্গে যুক্ত করে দেখার এই প্রাচীন জ্ঞান, আজকের আধুনিক সমাজের জন্যও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।