প্রকৃতিতে এমন কিছু রহস্য থাকে যা বিজ্ঞানও সহজে সমাধান করতে পারে না। তেমনই একটি নজির রয়েছে অসমে। ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্যে এক অদ্ভুত ও রহস্যময় জায়গা রয়েছে।
অসমের ডিমা হাসাও জেলার পাহাড়ে ঘেরা একটি ছোট্ট সুন্দর গ্রাম হল জাতিঙ্গা। বছরের বাকি সময় এই গ্রামটি অন্য পাঁচটা পাহাড়ি গ্রামের মতোই শান্ত থাকে। কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সময়ে এখানে এমন এক ঘটনা ঘটে, যা পুরো পৃথিবীর মানুষকে অবাক করে দেয়।
কী এই রহস্য? প্রতি বছর বর্ষাকালের শেষে, বিশেষ করে সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবর মাসে জাতিঙ্গা গ্রামের আকাশ এক অদ্ভুত রূপ নেয়। এই সময়ে, বিশেষ করে মেঘলা বা কুয়াশায় ঢাকা অমাবস্যার রাতে, আকাশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি মাটিতে পড়ে যেতে শুরু করে।
সাধারণত সন্ধে ৬টা থেকে রাত সাড়ে ৯টার মধ্যে এই ঘটনাটি ঘটে। পাখিগুলো খুব দ্রুত গতিতে উড়ে এসে ঘরের ছাদ, গাছপালা বা বাঁশঝাড়ে ধাক্কা খেয়ে নিচে পড়ে যায়। ভাল করে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, পাখিগুলো কিন্তু ইচ্ছে করে মরতে আসে না। মনে হয় যেন তারা হঠাৎ করে তাদের চোখের দৃষ্টি বা ওড়ার দিক হারিয়ে ফেলেছে।
এই ঘটনাটি পুরো গ্রামে ঘটে না। মাত্র দেড় কিলোমিটারের একটি নির্দিষ্ট জায়গার মধ্যেই পাখিগুলো এসে পড়ে। এর বাইরে সব স্বাভাবিক থাকে।
যে পাখিগুলো রাতে এসে পড়ে, তারা কিন্তু নিশাচর নয়। মাছরাঙা, বক, ফিঙে সহ প্রায় ৪০টি প্রজাতির পাখি, যারা সাধারণত দিনের আলোয় চলাফেরা করে, তারা এই ঘটনার শিকার হয়। দেখা গিয়েছে, বয়স্ক পাখিদের চেয়ে তুলনামূলকভাবে ছোট বা কম বয়সী পাখিরাই এভাবে বেশি পড়ে যায়।
বহু বছর আগে স্থানীয় আদিবাসীরা মনে করতেন, কোনও ভূত বা অশুভ শক্তি আকাশ থেকে নেমে এসে তাদের ওপর রাগ দেখাচ্ছে। এই ভয়ে তারা রাতে ঘর থেকে বের হতেন না। তবে ১৯৬০-এর দশকে বিজ্ঞানীরা প্রথম এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।
বিজ্ঞানীদের মতে, এটি কোনও অলৌকিক ঘটনা বা পাখিদের ‘আত্মহত্যা’ নয়। আসলে এই সময়ে পাহাড়ে প্রচণ্ড কুয়াশা থাকে এবং জোরে বাতাস বয়। কম উচ্চতায় ওড়ার সময় পাখিরা কুয়াশার কারণে দিক হারিয়ে ফেলে। তখন গ্রামের ঘরবাড়ির উজ্জ্বল আলো দেখে তারা সেদিকে আকৃষ্ট হয় এবং কুয়াশার মধ্যে দেওয়ালে বা গাছে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায়। অনেকে আবার মনে করেন, এই অঞ্চলের মাটির ভেতরের কোনো চৌম্বকীয় পরিবর্তনের কারণে পাখিদের দিক চেনার ক্ষমতা সাময়িকভাবে নষ্ট হয়ে যায়।
কীভাবে যাবেন জাতিঙ্গা? অসমের একমাত্র পাহাড়ি শহর হাফলং থেকে জাতিঙ্গা মাত্র ৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সবচেয়ে কাছের বিমানবন্দর হল গুয়াহাটি। সেখান থেকে জাতিঙ্গার দূরত্ব প্রায় ৩০০ কিলোমিটার। বিমানবন্দর থেকে গাড়ি ভাড়া করে নেওয়া যায়। চাইলে গুয়াহাটি বা লামডিং থেকে ট্রেনে চড়ে সরাসরি 'হাফলং হিল' স্টেশনে নেমে যাওয়া যায়। স্টেশন থেকে জাতিঙ্গা যাওয়ার জন্য সবসময় ট্যাক্সি বা অটো পাওয়া যায়। অসমের মূল শহরগুলো থেকে হাফলং যাওয়ার সুন্দর পাহাড়ি রাস্তা রয়েছে। বাস বা ব্যক্তিগত গাড়িতে করেও এখানে যাওয়া সম্ভব।
যদি আপনি এই সময়ে জাতিঙ্গা বেড়াতে যান, তবে মনে রাখবেন এটি একটি সংবেদনশীল প্রাকৃতিক ঘটনা। তাই সেখানে গিয়ে পাখিগুলোকে বিরক্ত করবেন না এবং স্থানীয় প্রশাসন ও বন দপ্তরের নিয়মকানুন মেনে চলবেন।















