গোপাল সাহা: মানব জীবনে মৃত্যু নির্ধারণ করে চিকিৎসক, সেই মৃত্যু স্বাভাবিক নাকি অস্বাভাবিক, সবটাই চিকিৎসকের দ্বারা নির্ধারণের মাধ্যমে তার পরবর্তী পদক্ষেপ করা হয়। স্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে মৃত্যুর শংসাপত্র (MCCD - medical certificate of cause of death) চিকিৎসক দ্বারা নথিভুক্ত করা এবং তারপর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা। আর অন্যদিকে অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসনের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত এবং তারপর তার ময়নাতদন্ত। ময়নাতদন্তের পর তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জেনে শেষকৃত্য সম্পন্ন করে তাঁর পরিবার। যদিও চিকিৎসক যে শংসাপত্র দেন সেটি আসলে মৃত্যুর কারণ দর্শিয়ে মেডিকেল সার্টিফিকেট, ডেথ সার্টিফিকেট নয়। মূলত ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করে সেই মৃত ব্যক্তির শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার পর স্থানীয় পৌরসভা বা পঞ্চায়েত। এমনটাই প্রথাগতভাবে চলে আসছে যুগ যুগ ধরে।
কিন্তু প্রশ্ন, গৃহস্থ বাড়িতে যে ব্যক্তির মৃত্যু ঘটেছে চিকিৎসকের চিকিৎসার পূর্বে, তাঁর মৃত্যু স্বাভাবিক নাকি অস্বাভাবিক তা নির্ধারণ সত্যি কি সম্পূর্ণ নাকি অসম্পূর্ণ?
বলা বাহুল্য এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই বিভিন্ন জটিলতার মধ্যে পড়তে হয় চিকিৎসা বিজ্ঞান বা ওই চিকিৎসককে, কারণ পরিস্থিতির নানা চাপে পড়ে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু হওয়া উক্ত ব্যক্তি নারী অথবা পুরুষ যার মৃত্যুর শংসাপত্র (MCCD) চিকিৎসক লিখতে অনেক ক্ষেত্রেই বাধ্য হন। কখনও পারিবারিক চাপ, আবার কখনও পরিস্থিতি প্রতিকূল হওয়ার কারণে কিংবা সাময়িক প্রভাবিত হওয়ার কারণে ময়নাতদন্ত কিংবা প্যাথলজিক্যাল অটোপসি ছাড়াই সেই বাড়িতে থাকা মৃত ব্যক্তির মৃত্যু সার্টিফিকেট অর্থাৎ শংসাপত্র চিকিৎসক (MCCD) 'মেডিকেল সার্টিফিকেট অফ কজ অফ ডেথ' নথিভুক্ত করেন।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে এবং আইনতভাবে নিয়ম মেনে অস্বাভাবিক মৃত্যু ছাড়া চিকিৎসকের অজ্ঞাত অবস্থায় মৃত ব্যক্তির শংসাপত্র দেওয়ার পূর্বে প্যাথলজিক্যাল অটোপ্সি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলেই জানাচ্ছে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা।
ফরেনসিক মেডিসিন চিকিৎসক বিশেষজ্ঞের মত ও ডেথ সার্টিফিকেট (MCCD):
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে গৃহস্থদের পারিবারিক বিভিন্ন কারণে বা বাড়ির কোন সদস্যদের মৃত্যুর কারণ স্বাভাবিকভাবে হয় না। কখনো পড়ে গিয়ে কিংবা ধাক্কা লেগে বেকায়দায় পড়ে গিয়ে মৃত্যু হয়, যা একেবারেই অস্বাভাবিক মৃত্যু, আবার অত্যাচারিত বা হত্যার অভিসন্ধি নিয়ে স্বাভাবিক মৃত্যুর রূপ দেওয়ার চেষ্টা হয়। সেক্ষেত্রে সিংহভাগ পরিবারই পুলিশকে বা স্থানীয় প্রশাসনকে না জানিয়ে কিংবা প্রভাব খাটিয়ে (কোয়েক ডাক্তার) লোকাল প্রেকটিসনার কে দিয়ে কিংবা স্থানীয় চিকিৎসক কে দিয়ে মৃত্যু শংসাপত্র বা (MCCD) 'মেডিকেল সার্টিফিকেট অফ কজ অফ ডেথ' নথি তৈরি করায়, যা সম্পূর্ণ বেআইনি। যেখানে জরুরী পুলিশকে অর্থাৎ স্থানীয় প্রশাসনকে অবশ্যই জানানো এবং ময়না তদন্ত করা কিংবা চিকিৎসককে সঠিক তথ্য জানিয়ে প্যাথলজিক্যাল অটোপসি করানো সত্য উদঘাটনের জন্য। বরং এই ধরনের আইনি পথ অবলম্বন না করে দেখা যায় শেষকৃত্য সম্পন্ন করার জন্য ঝামেলা ঝঞ্ঝাট এড়াতে MCCD নথি করিয়ে নেয় সেই সমস্ত পরিবার প্রভাব খাটিয়ে, যা সম্পূর্ণভাবে বেআইনি।
উল্লেখযোগ্য বিষয়, আইন অনুযায়ী কোন ব্যক্তির সরকারি হাসপাতালে মৃত্যু হলে সেক্ষেত্রে চিকিৎসক ফর্ম 4 এবং বেসরকারি হাসপাতাল বা বাড়িতে মৃত্যু হলে ফর্ম 4A পূরণ করতে হয়, যাকে মূলত MCCD বা মৃত্যু শংসাপত্র তৈরি করা উচিত। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই নিয়ম অনুসরণ করা হয় না। ঝামেলা, সময় ও খরচা এড়াতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্থানীয় চিকিৎসক বা কোয়াক প্র্যাক্টিশনার কে দিয়ে নথি বা প্রাথমিক ডেথ সার্টিফিকেট তৈরি করে নেওয়া হয়, যা সম্পূর্ণ অনৈতিক।
বলাবাহুল্য, আইন অনুযায়ী একজন চিকিৎসক ফর্ম 4 অথবা 4A পূরণ করে মেডিকেল সার্টিফিকেট অফ কজ অফ ডেথ (MCCD) নথি ইস্যু করেন, আর শেষকৃত্য সম্পন্নের জায়গা থেকে যে সার্টিফিকেট বা সংশপত্র (ক্রিমেসন সার্টিফিকেট) প্রাপ্ত হয় তা জমা করলে তবেই সেই এলাকার পুরসভা বা পঞ্চায়েত চূড়ান্ত মৃত্যু শংসাপত্র বা ডেথ সার্টিফিকেট নামে নথি দেন। এই শংসাপত্রই আইনতভাবে গৃহীত হয়। সাধারণত চিকিৎসক যে ডেথ সার্টিফিকেট নামে নথি ইস্যু করেন সেটি আসলে কোনভাবেই ডেথ সার্টিফিকেট নয়, সেটি আসলে (MCCD) 'মেডিকেল সার্টিফিকেট অফ কজ অফ ডেথ' নথি। পূর্বে বা বর্তমানেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসক কিংবা কোয়াক প্র্যাকটিসানার যে ডেথ সার্টিফিকেট নামে নথি ইস্যু করেন সেটি সম্পূর্ণ অনৈতিক এবং আইনতভাবে কতটা সঙ্গত সেই নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিশেষজ্ঞরা ও প্রশাসন বিভাগ পর্যন্ত। যদি কোন অবস্থায় তা চ্যালেঞ্জ করা হয় তাহলে সেই ক্ষেত্রে চিকিৎসক আইনতভাবে জটিলতার সম্মুখীন হতে পারেন। যা নিয়ে বহু বিতর্ক বা সংশয় রয়েছে সমাজ ব্যবস্থায়, যাকে দূর করা অতি আবশ্যিক বলেই দাবি চিকিৎসক বিশেষজ্ঞদের।
উল্লেখযোগ্য বিষয়, আমেরিকা (USA), (UK) লন্ডন এর মত প্রথম বিশ্বের দেশ গুলিতে মৃত্যু শংসাপত্র অর্থাৎ MCCD নথিভুক্ত করতে দুজন ডাক্তারের বা চিকিৎসকের স্বাক্ষর প্রয়োজন। সেই সমস্ত দেশগুলিতে একজন চিকিৎসকের স্বাক্ষর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হয় না।
ডেথ সার্টিফিকেট (Medical Certificate of Cause of Death – MCCD)
মেডিকেল কাউন্সিলর নির্দেশিকা অনুযায়ী এবং আইনতভাবেও শুধুমাত্র সেই চিকিৎসক মৃত্যু শংসাপত্র কিংবা ডেথ সার্টিফিকেট দিতে পারেন,
যিনি শেষ অসুখে রোগীকে চিকিৎসা করেছেন, অথবা যিনি হাসপাতালে রোগীর মৃত্যু প্রত্যক্ষ করেছেন।
চিকিৎসা জগতে যেই কাজগুলো আইনত ও নৈতিকভাবে ভুল:
১. বাড়িতে মৃত্যু হলে, রোগীকে কখনও না দেখা ডাক্তার দিয়ে ডেথ সার্টিফিকেট লেখা
'Broad death', 'Natural death' লিখে দায় এড়ানো।
২. হাসপাতালে মৃত্যু নয় এমন রোগীর জন্য হাসপাতালের নামে সার্টিফিকেট, অন্য ডাক্তারের কাছে পাঠিয়ে “ম্যানেজ করে নেওয়া”
যা, Birth & Death Registration Act + MCI/NMC ethics অনুযায়ী সম্পূর্ণ ভুল, এই ঘটনায় ভবিষ্যতে ডাক্তার আইনি ঝুঁকিতেও পড়তে পারেন।
আইনজীবী ও চিকিৎসকদের মতামত :

এই বিষয়ে আমাদের সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছিলেন IMA কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক ও চিকিৎসাশংসাপত্র বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক শিবব্রত ব্যানার্জি। তিনি বলেন, "কোন চিকিৎসক যদি মৃত্যু সংসারপত্র অর্থাৎ ডেথ সার্টিফিকেটে দেন তাহলে সেটা তার সম্পূর্ণ নিজের দায়িত্ব। না জেনে কোন মৃত্যুর দেওয়া সম্পূর্ণই বেআইনি। পরবর্তীতে কোনরকম সমস্যা হলে সেই চিকিৎসককেই সমস্যার মুখে পড়তে হবে এবং সেই দায়িত্ব তাকেই নিতে হবে। এর দায় অন্য কারো নয়। একজন চিকিৎসক চাইলে পরিস্থিতির চাপে পড়ে মৃত্যু শংসাপত্র দিতে বাধ্য হলেও পরবর্তীতে তিনি গিয়ে স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে লিখিত অভিযোগ দিতে পারেন। অথবা তার মেডিকেল কাউন্সিল ও (IMA) ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন কে ও এ বিষয়ে অবশ্যই লিখিতভাবে জানানো উচিত।"
চিকিৎসক আরো বলেন, "একজন চিকিৎসক চাইলে মৃত্যু শংসাপত্র লেখার জন্য চাপ দিলে সেখান থেকে তিনি নানা কৌশলে বেরিয়ে আসতে পারেন মৃত্যু শংসাপত্র না দিয়ে। তবে সেই বাড়িতে থাকা ব্যক্তির মৃত্যু কোন রকম ভাবে সন্দেহজনক মনে হলে অবশ্যই উচিত স্থানীয় পুলিশকে জানানো ময়না তদন্তের জন্য (মেডিকেলিগাল অটোপসি), কিংবা পুলিশকে না জানিয়েও প্যাথলজিক্যাল অটোপসি করে সেই মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর সংশয় দূর করতে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কর্মরত সেই চিকিৎসক।"
“মেডিকেল ও আইনি দিক থেকে মৃত্যু শংসাপত্র দেওয়ার নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। যে চিকিৎসক রোগীকে শেষ অসুখে চিকিৎসা করেছেন বা হাসপাতালে মৃত্যুর সময় উপস্থিত ছিলেন, শুধুমাত্র তিনিই ডেথ সার্টিফিকেট দিতে পারেন।
বাড়িতে বা হাসপাতালে পৌঁছনোর আগেই মৃত্যু হলে, সেই ক্ষেত্রে অন্য কোনও ডাক্তার বা হাসপাতাল থেকে ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়া আইনত সঠিক নয়। এ ধরনের ক্ষেত্রে পুলিশ ইনকোয়েস্ট ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত।”
“চাপের মুখে ‘ব্রড ডেথ’ বা ‘ন্যাচারাল ডেথ’ লিখে দেওয়া চিকিৎসকদের জন্য ভবিষ্যতে বড় আইনি সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই রোগীর পরিবার, চিকিৎসক— দু’পক্ষের স্বার্থেই সঠিক আইনি পথ অনুসরণ করা জরুরি।”

এই বিষয়ে আমাদের সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে প্রখ্যাত চিকিৎসক যোগীরাজ রায় স্পষ্ট করে বলেন, "অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় পরিবারের বয়স্ক মানুষদের উপরে সম্পত্তিজনিত কারণে কৌশলে অপরাধমূলক কাজ বা শাশ্রুত করে হত্যা করে করে স্থানীয় চিকিৎসকদের উপর প্রভাব খাটিয়ে কিংবা সম্পূর্ণ তথ্য অজ্ঞাত রেখে মৃত্যু শংসাপত্র বা প্রাথমিক ডেথ সার্টিফিকেট (MCCD) লিখিয়ে নেন, যাতে কোন রকম আইনি জটিলতা বা বিপদের মুখে না পড়তে হয়। এক্ষেত্রে ওই চিকিৎসককে সচেতন থাকা উচিত এবং শংসাপত্র না দেওয়া। বিনা চিকিৎসায় এই শংসাপত্র ও দিলে চিকিৎসকে নিজের দায় নিজেকে নিতে হবে।"

এই বিষয় নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে আমাদের সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে চিকিৎসক ও মেডিকেল অফিসার তাপস প্রামানিক বলেন, "মেডিকেল ও আইনি দিক থেকে মৃত্যু শংসাপত্র দেওয়ার নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। যে চিকিৎসক রোগীকে শেষ অসুখে চিকিৎসা করেছেন বা হাসপাতালে মৃত্যুর সময় উপস্থিত ছিলেন, শুধুমাত্র তিনিই ডেথ সার্টিফিকেট বা MCCD দিতে পারেন। বাড়িতে বা হাসপাতালে পৌঁছনোর আগেই মৃত্যু হলে, সেই ক্ষেত্রে অন্য কোনও ডাক্তার বা হাসপাতাল থেকে ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়া আইনত সঠিক নয়। এ ধরনের ক্ষেত্রে পুলিশ ইনকোয়েস্ট ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত। চাপের মুখে ‘ব্রড ডেথ’ বা ‘ন্যাচারাল ডেথ’ লিখে দেওয়া চিকিৎসকদের জন্য ভবিষ্যতে বড় আইনি সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই রোগীর পরিবার, চিকিৎসক—দু’পক্ষের স্বার্থেই সঠিক আইনি পথ অনুসরণ করা জরুরি।”
এই বিষয় নিয়ে আমাদের সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে কলকাতা হাইকোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী সুমিত্রা নিয়োগী ভট্টাচার্য বলেন, "আইনটা মানুষের স্বার্থে মানুষের উপকারের জন্য অপকারের জন্য নয়। তাই চিকিৎসকদের উচিত এ ধরনের শংসাপত্র দেওয়ার আগে পুরো বিষয়টা ভালো করে খতিয়ে দেখে নেওয়া এবং যাতে কোনরকম ভুলভ্রান্তি বা তদন্তে ব্যাঘাত না ঘটে সেদিকে সেই চিকিৎসকের নজর রাখা। কারণ একজন চিকিৎসক তিনি মৃত্যু শংসাপত্র বা প্রাথমিক ডেথ সার্টিফিকেট না জেনে হিসু করলে তা যেমন আইনি জটিলতা বা তদন্তে ব্যাঘাত করতে পারে, পাশাপাশি সেই চিকিৎসক নিজেও বিপদে পড়তে পারেন। এমনকি তার চিকিৎসা ডিগ্রী পর্যন্ত বাতিল হতে পারে।"
আইনজীবী ও চিকিৎসক বিশেষজ্ঞদের মতে , "সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানো খুব জরুরি, কারণ ভুল কজ অফ ডেথ সার্টিফিকেট (MCCD) শুধু আইনগত সমস্যা নয়, ভবিষ্যতে বিমা, সম্পত্তি, এমনকি ফৌজদারি মামলার জটিলতা তৈরি করতে পারে সেই ক্ষেত্রে।”
