আজকাল ওয়েবডেস্ক: অর্থনৈতিক দুর্দশা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সৃষ্ট বিক্ষোভ সামলাতে ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন ভারত নীরবে উদ্বেগ কাঁধে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। দীর্ঘদিন ধরেই নয়াদিল্লি এবং তেহরান কৌশলগত আঞ্চলিক অংশীদার। পাকিস্তান- আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় ভারতের স্থলপথ বন্ধ করে দেওয়ায়, ইরান দীর্ঘদিন ধরে নয়াদিল্লির জন্য একমাত্র কার্যকর পশ্চিমী করিডোর হিসেবে কার্যকরী। তেহরানের শিয়া নেতৃত্ব পাকিস্তানের প্রভাবকে প্রতিহত করে ভারতের সতর্কভাবে সাজানো পশ্চিম এশিয়া নীতিতে একটি স্থিতিশীল স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেছে।

ইরানের বর্তমান শাসককূলের ধরাশায়ী অবস্থা ভারতের কৌশলগত ক্ষেত্রকে প্রতিকূলভাবে প্রভাবিত করতে পারে। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে শাসন পরিবর্তন, পাকিস্তান মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদী চ্যালেঞ্জ, চীনের আঞ্চলিক সম্প্রসারণ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন নীতির কারণে ভারতের বিদেশনীতির কৌশলকে অনেকটাই সংকটের দিকে  ঠেলে দিচ্ছে। অস্থিতিশীল ইরানে নয়া শাসক এলে, কূটনৈতিক জোট, বাণিজ্য পথ এবং নিরাপত্তা হিসাব-নিকাশকে নতুন করে সাজাতে পারে। ফলে বেকায়দায় পড়তে পারে ভারত।

ভারতের জন্য ইরান কেন গুরুত্বপূর্ণ?

- চাবাহার বন্দর: পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় ভারতকে স্থলপথে প্রবেশাধিকার না দেওয়ায়, ইরান পশ্চিমী সংযোগের জন্য ভারতের বিশ্বস্ত স্থল সেতু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ভারতের কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের চাবাহার বন্দর, যা নয়া দিল্লিকে ইরানি উপকূলে সরাসরি প্রবেশাধিকার দেওয়ার জন্য তেরি করা হয়েছে। চাবাহার বন্দরের মাধ্যমে পাকিস্তানকে পাশ কাটিয়ে, স্থল ও রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ভারত মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে।

কিন্তু এই বন্দরে যাওয়ার পথ যেসব রাষ্ট্রের মদ্যে অবস্থিত সেগুলোতে, রাজনৈতিক সংহতি, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন। তাই তেহরানে শাসন পরিবর্তন ভারতকে তীব্র ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়ার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাজন কুমার বলেন, "খামেইনি-পরবর্তী ক্ষমতার লড়াইয়ে চাবাহার একটি কৌশলগত সম্পদ নাও হতে পারে।"

পাকিস্তান: ইরান, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়া সত্ত্বেও- ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলে পাকিস্তানের প্রভাবকে ভারসাম্যপূর্ণ করেছে। তেহরানের শিয়া নেতৃত্ব, পাকিস্তানে সুন্নি চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর অন্যতম সোচ্চার সমালোচক। উল্লেখ্য, পাক সুন্নীপন্থীরাই ভারত-বিরোধী প্রচার চালাচ্ছে এবং ভারতীয় স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করছে। ১৯৯০-এর দশক এবং ২০০০-এর দশকের শুরুতে তেহরানের শিয়া অবস্থান ভারতের জন্য অত্যন্ত অনুকূল ছিল। সেই সময়ে পাকিস্তান-সমর্থিত তালিবান আফগানিস্তানে "কৌশলগত গভীরতা" অর্জনের চেষ্টা করছিল, আর ইরান ও ভারত তালিবান-বিরোধী শক্তিগুলোকে সমর্থন করার জন্য কাজ করছিল। এই অভিন্ন অবস্থান এই অঞ্চলে পাকিস্তানের প্রভাবকে সীমিত করেছিল এবং আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের উপর তাদের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা থেকে বিরত রেখেছিল। এমনকী ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে যখন ইসলামাবাদ কাশ্মীরের ইস্যুতে ভারতের উপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য চাপ দিয়েছিল, তখনও তেহরান দিল্লির সাহায্যে এগিয়ে এসেছিল।

যদি ইরান অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে পাকিস্তান পরোক্ষভাবে লাভবান হবে এবং এই অঞ্চলে তার প্রতিপক্ষ শক্তি দুর্বল হয়ে পড়বে।

বাণিজ্য: ভারত ইরানের অষ্টম বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার, গত বছর দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১.৩-১.৭ বিলিয়ন ডলার। নয়াদিল্লি চাবাহার এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলিতে এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দিল্লি ইতিমধ্যেই প্রকল্পের কিছু অংশ বিলম্বিত বা পুনর্গঠন করেছে। যেকোনও শাসন পরিবর্তন এই বিনিয়োগকে প্রভাবিত করতে পারে, যা সরাসরি করদাতাদের অর্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

চীনের প্রভাব: পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ইরান ভারতের পক্ষে থাকলেও, চীনের প্রতি তার পক্ষপাতিত্ব উপেক্ষা করার মতো নয়। বেজিং এবং তেহরান ২০২১ সালে একটি ২৫-বছর মেয়াদী কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর প্রভাব বাণিজ্য চিত্রেও দেখা যাচ্ছে। ২০১৫ সালে চীন ছিল ইরানের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার, যেখানে ১৪.৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের ইরানি পণ্য চীনে গিয়েছিল।

প্রকৃতপক্ষে, পশ্চিমী দেশগুলোর একাধিক নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে যাওয়ায়, তেহরান তার ছাড়যোগ্য তেল কেনা এবং পরিকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য বেজিংয়ের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়েছে। ইরানে ভারতের উপস্থিতি - বিশেষ করে চাবাহারে – চীনের অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে যায়।

যদি ইরানে বিশৃঙ্খলা চলতে থাকে, তবে একটি নতুন শাসনব্যবস্থাও নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগের জন্য বেইজিংয়ের উপর নির্ভর করতে পারে, যা এই অঞ্চলে তার প্রভাব বাড়িয়ে দেবে। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানি কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই খুজেস্তানে চীনা অর্থায়নে বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং বন্দর প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করছেন।

ভারতের পরবর্তী পদক্ষেপ
ভারতের প্রাক্তন কূটনীতিক এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও শ্রীলঙ্কায় ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী নিরুপমা মেনন রাওয়ের মতে, এখন পর্যন্ত ইরানের প্রতি ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি পরিমাপিত এবং সতর্কতার সঙ্গে নির্ধারিত হতে হবে। তিনি এক্স-এ একটি পোস্টে বলেছেন, "নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা উচিত, কারণ ইরানের পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বাইরের শক্তিগুলো এর পরিণাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না, বা নির্ভরযোগ্যভাবে ফলাফলকেও প্রভাবিত করতে পারবে না। প্রথম কর্তব্য হল সুরক্ষা: ইরানে এবং বৃহত্তর অঞ্চলে ভারতীয় নাগরিকদের স্বার্থকে শক্তিশালী কনস্যুলার প্রস্তুতি এবং জরুরি পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে রক্ষা করতে হবে।"

রাও উল্লেখ করেছেন যে, ভারতের উচিত সবদিক থেকে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো না করা। তিনি বলেন, "গুরুত্বপূর্ণ হল- মন্তব্য করা নয়, বরং প্রস্তুতি গ্রহণ করা: পরিস্থিতি কোন দিকে যেতে পারে, কী ধরনের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, এবং যোগাযোগের কোন মাধ্যমগুলো খোলা রাখতে হবে, তা বোঝা।"

প্রাক্তন কূটনীতিক রাও আরও বলেন, "যদি ইরান দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা বা বিভাজনের দিকে এগোয়, তবে তার পরিণতি সীমাবদ্ধ থাকবে না। পশ্চিম এশিয়ার বিশৃঙ্খলা জ্বালানি বাজার, নৌপথ, প্রবাসী জনগোষ্ঠীর দুর্বলতা এবং জঙ্গিবাদ ও অপরাধী নেটওয়ার্কের বৃহত্তর পরিবেশের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। দক্ষিণ এশিয়াও এর থেকে সুরক্ষিত নয়। তাই ভারতের কৌশল হওয়া উচিত কৌশলগত সতর্কতা, অবিচল সম্পৃক্ততা এবং ধারাবাহিক মূল্যায়ন, একই সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ে ভান করা বা একটি চলমান সংকটকে অতিরিক্ত ব্যাখ্যা করার প্রলোভন থেকে বিরত থাকা।"