আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইরান যুদ্ধ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবর্তনশীল অবস্থানের কারণে তেল, সোনা, ক্রিপ্টো ও স্টক মার্কেটে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল। এর ফলে বিভিন্ন দেশ, কর্পোরেট সংস্থা, ব্যবসায়ী এবং সুযোগসন্ধানীরা বাজি ধরে, বাজারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং কৌশলগত পদক্ষেপের মাধ্যমে শত শত কোটি ডলার মুনাফা অর্জন করেছে। এটি ছিল কার্যত একটি ডাকাতি। এই টাকাটা কামিয়েছে কারা?

গত ৪০ দিনে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েল যুদ্ধ নিয়ে বিশ্ব এক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। ট্রাম্প একাধিকবার, এমনকি একদিনের মধ্যেই বার বার তাঁর অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। ইরান যখন উপসাগরীয় দেশগুলিতে তেল ও গ্যাস স্থাপনায় হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে সামুদ্রিক বাণিজ্য ব্যাহত করে, তখন বিশ্ববাজারে চরম অস্থিরতা দেখা দেয়। কিন্তু বিভিন্ন রাষ্ট্র, কোম্পানি এবং ব্যক্তি মুদ্রা, ক্রিপ্টো, স্টক ও বন্ড থেকে শুরু করে সোনা, গ্যাস, তেল এবং অন্যান্য পণ্যের বাজারে পক্ষে বা বিপক্ষে বাজি ধরে এই বিশৃঙ্খলা থেকে লাভবান হয়েছে। 

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের উপর ইজরায়েল ও আমেরিকার যৌথ হামলার পরে যুদ্ধ শুরু হয়। এই হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই এবং একাধিক শীর্ষ নেতা নিহত হন। পরবর্তী ঘটনাবলী তেল, সোনা, বন্ড, স্টক, প্রেডিকশন মার্কেট এবং ক্রিপ্টো-সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ৭২ ডলার থেকে বেড়ে ১২০ ডলারের উপরে পৌঁছলেও পরে তা কমে প্রায় ৯০ ডলারে নেমে আসে। সোনার দাম প্রথমে বেড়ে গেলেও পরে রেকর্ড স্তর থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কায় মার্কিন ট্রেজারি ইল্ড বৃদ্ধি পায় এবং ১০-বছর মেয়াদি নোটের ইল্ড ৩.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪.৩ শতাংশ হয়। প্রতিরক্ষা খাতের স্টকগুলির দাম বেড়ে যায়।

বেশ কয়েকটি বাজি ধরার সময়কাল ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের সঙ্গে খুবই সাদৃশ্যপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ফিউচার ও অপশনস মার্কেটে এবং পলিমার্কেটের মতো পূর্বাভাস সাইটগুলিতে নেওয়া পজিশন। যা ট্রাম্প প্রশাসন ও অন্যদের যুদ্ধ-সম্পর্কিত ঘোষণার মাত্র কয়েক মিনিট বা ঘণ্টা আগে নেওয়া হয়েছিল। কারসাজি এবং নৈতিকতা লঙ্ঘনের বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। যারা লাভবান হয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারী, সরকার এবং কর্পোরেট সংস্থা। ইরান নিজেও হরমুজ প্রণালীর বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়েছে।

পলিমার্কেটের মতো পূর্বাভাস সাইটগুলিতে একাধিক অ্যাকাউন্ট, যার মধ্যে কিছু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন করে তৈরি করা হয়েছিল, শুধুমাত্র ইরান-যুদ্ধ-সম্পর্কিত ঘটনাবলীর উপর বাজি ধরেছিল। মার্কিন বা ইজরায়েলি হামলা, খামেনেইয়ের অপসারণ এবং যুদ্ধবিরতির উপর বেশ কয়েকটি বাজি ধরা হয়েছিল। একজন ট্রেডার ইরানের উপর পাঁচ-অঙ্কের বাজিতে ৯৩ শতাংশ জয়ের হার অর্জন করেন।
 
‘মাগামাইম্যান’ নামে একজন ট্রেডার একাই খামেনেইয়ের ক্ষমতা হারানোর একটি মাত্র বাজিতে ৫৫৩,০০০ ডলার আয় করেন। জানা গিছে, ছ’টি অ্যাকাউন্ট সম্মিলিতভাবে ২ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে। এটি ইনসাইডার ট্রেডিং নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তোলে, এবং নানা রিপোর্ট ইঙ্গিত দেয় যে কিছু বিনিয়োগকারী সম্ভবত মার্কিন সামরিক বাহিনী বা হোয়াইট হাউস থেকে তথ্য পাচ্ছিলেন। 

ব্রেন্ট/ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের ফিউচার থেকে লক্ষ লক্ষ ডলার মুনাফা হয়েছে। যারা শর্ট পজিশনে ছিলেন, তারা তেলের দাম কমার ফলে লাভবান হয়েছেন। এদিকে, ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে প্রধান তেল কোম্পানিগুলি এবং রাশিয়ার মতো উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরের উৎপাদকরা লাভবান হয়েছে। পূর্বের ছাড় সত্ত্বেও রাশিয়ার তেল রাজস্ব বেড়েছে। যুদ্ধের আশঙ্কায় অনেক জ্বালানি খাতের শেয়ারের দামও বেড়েছে।

যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত আমেরিকান কোম্পানিগুলি, যার মধ্যে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের সঙ্গে যুক্ত কিছু প্রতিরক্ষা ঠিকাদারও রয়েছে, মুনাফা করেছে বলে জানা গিয়েছে। লকহিড মার্টিন, নর্থরপ গ্রামান এবং আরটিএক্স-এর মতো প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলির শেয়ারের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। 

একাধিক রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, যুদ্ধের গতিপ্রকৃতির সঙ্গে ট্রাম্প পরিবারের সংস্থাগুলির সরাসরি ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত ছিল। যার মধ্যে তাঁর জামাই ও প্রধান শান্তি আলোচক জ্যারেড কুশনারের প্রতিষ্ঠানগুলিও রয়েছে। কুশনারের একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার ৯৯ শতাংশ বিনিয়োগ আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং কাতারের মতো উপসাগরীয় সম্পদ তহবিল থেকে। প্রতিষ্ঠানটির সম্পদের পরিমাণ বেড়ে ৬.২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছিল। জানা গিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের কূটনীতিতে জড়িত থাকাকালীন তিনি মধ্যপ্রাচ্যের সরকারগুলির কাছ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। 

যুদ্ধের মধ্যে সোনা থেকে ফ্রান্স এবং বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক লাভবান হয়েছিল। ব্যাঙ্ক ডে ফ্রান্স নিউইয়র্ক ফেড থেকে তাদের শেষ ১২৯ টন সোনা দেশে ফিরিয়ে আনে। তারা আমেরিকায় থাকা পুরোনো বারগুলি সর্বোচ্চ দামে বিক্রি করে এবং ইউরোপ বা প্যারিস থেকে সমপরিমাণ উচ্চমানের সোনা ক্রয় করে। এর ফলে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার মূলধনী লাভ হয়েছিল। এই লেনদেনগুলির সময়কাল যুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল। অন্যান্য ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলিও ডলার-নির্ভরতা থেকে সরে এসে বিনিয়োগে বৈচিত্র এনেছে। 

হরমুজ প্রণালী বন্ধ ঘোষণা করা সত্ত্বেও, ইরান ব্যারেল প্রতি ১ ডলার ফি-এর বিনিময়ে বেছে বেছে ‘বন্ধু’ জাহাজগুলিকে যাতায়াতের অনুমতি দিচ্ছিল। এই লেনদেন ইউয়ান বা স্টেবলকয়েনের মাধ্যমে পরিচালিত হত। প্রতিটি জাহাজের জন্য মোট লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ২০ লক্ষ ডলার বলে অনুমান করা হয়।