আজকাল ওয়েবডেস্ক: ওয়াশিংটন ও বেজিংয়ের মধ্যে পরমাণু প্রতিদ্বন্দ্বিতা যখন ক্রমশ তীব্র হচ্ছে, ঠিক তখনই উত্তর-পশ্চিম চীনের দুর্গম মরুভূমিতে বিশাল এক সামরিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার খবর সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্সের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জিনজিয়াং ও গানসু প্রদেশের পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র সাইলো বা ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণাগারগুলোর আশেপাশে রকেট লঞ্চ প্যাড, বাঙ্কার, যোগাযোগ কেন্দ্র এবং অন্যান্য সহযোগী কাঠামোর এক বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করছে চীন। উপগ্রহ চিত্রে ধরা পড়া এই বিপুল নির্মাণযজ্ঞ দেখে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, শত্রুভাবাপন্ন দেশগুলো যদি আগে আঘাতও হানে, তবুও যাতে চীন পাল্টা পরমাণু হামলা বা 'সেকেন্ড-স্ট্রাইক' চালানোর ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে, সেই উদ্দেশ্যেই এই মরুভূমিতে ঘাঁটি শক্ত করা হচ্ছে।
রয়টার্সের হাতে আসা নতুন উপগ্রহ চিত্রগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মরুভূমির হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ৮০টিরও বেশি এমন লঞ্চ প্যাড তৈরি করা হয়েছে, যা দিয়ে মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী যান এবং আকাশসীমা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনা করা সম্ভব। এছাড়া সেখানে রয়েছে সুরক্ষিত সামরিক বাঙ্কার, অস্ত্রাগার, বিমানঘাঁটি ও অত্যাধুনিক যোগাযোগ কেন্দ্র। বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের মূল লক্ষ্য হলো তাদের স্থলভিত্তিক পরমাণু বাহিনীকে যেকোনও পরিস্থিতিতে সুরক্ষিত রাখা, যেন কোনও সম্ভাব্য যুদ্ধের শুরুতে শত্রুদেশ এগুলো সহজে ধ্বংস করতে না পারে।
ঐতিহাসিকভাবে চীন সবসময়ই একটি সীমিত কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য পরমাণু প্রতিরোধ ব্যবস্থা বজায় রাখার নীতি মেনে এসেছে। তাদের পরমাণু কৌশল মূলত 'আগে আঘাত নয়, আক্রান্ত হলে পাল্টা জবাব দেব'—এই দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে। প্যাসিফিক ফোরামের গবেষক আলেকজান্ডার নিল রয়টার্সকে জানিয়েছেন, এই পরিকাঠামো যেভাবে মরুভূমির বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে তৈরি করা হচ্ছে, তা এককথায় অভূতপূর্ব। এটি চীনের কৌশলগত পরমাণু প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে এবং বৈচিত্র্যময় করে তুলবে।
এই পুরো সামরিক নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পূর্ব জিনজিয়াংয়ের দুটি বিশাল আটকোণা বা অষ্টভুজাকৃতির সামরিক কমপ্লেক্স। গত ছয় বছর ধরে হামি ক্ষেপণাস্ত্র সাইলো ফিল্ডের কাছাকাছি এগুলো তৈরি করা হয়েছে। উপগ্রহ চিত্রে দেখা যাচ্ছে, এই কমপ্লেক্সগুলোর ভেতরে সামরিক কর্মীদের আবাসন, বাঙ্কার ও বড় বড় গুদাম রয়েছে, যা সড়ক ও রেলপথের মাধ্যমে মূল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের সাথে যুক্ত। এমনকি সম্প্রতি এই এলাকার আশেপাশে বড় সামরিক যানবাহন ও অস্থায়ী শিবিরের আনাগোনাও লক্ষ্য করা গেছে।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এখানকার কিছু কিছু লঞ্চ প্যাড আকারে এতটাই বড় যে তা দিয়ে রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা আইসিবিএম (ICBM) উৎক্ষেপণ করা সম্ভব। অন্য প্যাডগুলো হয়তো বিমান প্রতিরক্ষা বা ইলেকট্রনিক যুদ্ধকৌশলের কাজে ব্যবহারের জন্য তৈরি। তবে কার্নেগি এন্ডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের গবেষক টং ঝাও মনে করেন, এই রহস্যময় টাওয়ার এবং আটকোণা কাঠামো মূলত পরমাণু বাহিনীর পরিচালনা ও যোগাযোগের প্রধান কেন্দ্র বা 'কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল' ব্যবস্থার অংশ। একই সাথে চীন তার উপগ্রহ ব্যবস্থারও আধুনিকীকরণ করেছে, যার মাধ্যমে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে ধেয়ে আসা যেকোনও ক্ষেপণাস্ত্র সনাক্ত করা সম্ভব।
এই মরুভূমির বুকে চীনের এই অবিশ্বাস্য আয়োজন দেখে আন্তর্জাতিক পরমাণু নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বেশ অবাক হয়েছেন। ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টের ডিরেক্টর হ্যান্স ক্রিস্টেনসেন স্পষ্টই বলেছেন যে, তিনি তার কর্মজীবনে এর আগে কখনো এমন কিছু দেখেননি। আমেরিকার প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের পরমাণু ওয়ারহেডের সংখ্যা ১ হাজারে পৌঁছাতে পারে এবং আমেরিকার যেকোনও প্রান্তে আঘাত হানতে সক্ষম এমন অন্তত ১০০টি আইসিবিএম ইতিমধ্যেই মোতায়েন করা হয়েছে। তাই তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও চীনের মধ্যে তৈরি হওয়া বর্তমান উত্তেজনার আবহে, বেজিংয়ের এই পরমাণু সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।















