আজকাল ওয়েবডেস্ক: মৃত্যু ঠিক কখন ঘটে—হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়ার মুহূর্তে, নাকি মস্তিষ্কের সব কার্যকলাপ থেমে গেলে? এই প্রশ্ন বহুদিন ধরেই চিকিৎসাবিজ্ঞান, দর্শন এবং সাধারণ মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, হৃদযন্ত্র থেমে যাওয়ার পরও কিছু সময়ের জন্য মস্তিষ্কে বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ টিকে থাকতে পারে। ফলে “মৃত্যু”র সংজ্ঞা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সাধারণভাবে আমরা মনে করি, হৃদপিণ্ড বন্ধ হলেই মৃত্যু ঘটে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে বলা হয় “কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট”। কিন্তু কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট মানেই সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের সব কাজ বন্ধ হয়ে যায়—এমনটা নয়। হৃদযন্ত্র রক্ত পাম্প করা বন্ধ করলে মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, অক্সিজেনের অভাব শুরু হওয়ার পর কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট পর্যন্ত মস্তিষ্কে কিছু বৈদ্যুতিক তরঙ্গ দেখা যেতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা আইসিইউতে থাকা রোগীদের ওপর পর্যবেক্ষণ চালিয়ে দেখেছেন, হৃদস্পন্দন থেমে যাওয়ার পরও ইইজি যন্ত্রে কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের তরঙ্গ ধরা পড়েছে। বিশেষ করে “গামা ওয়েভ” নামে পরিচিত উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির তরঙ্গ, যা সচেতনতা, স্মৃতি এবং স্বপ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত, তা সাময়িকভাবে সক্রিয় থাকতে পারে।
এই আবিষ্কার “নেয়ার-ডেথ এক্সপেরিয়েন্স” বা মৃত্যুপূর্ব অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বহু মানুষ ক্লিনিক্যালি মৃত ঘোষণার আগে বা পরে অদ্ভুত আলোর ঝলক, জীবনের স্মৃতি ভেসে ওঠা বা শরীরের বাইরে থাকার অনুভূতির কথা বলেছেন। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়ার পর মস্তিষ্কে হঠাৎ রাসায়নিক পরিবর্তন ও বৈদ্যুতিক স্রোতের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এমন অভিজ্ঞতার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, হৃদযন্ত্র বন্ধ হওয়ার পর মানুষ দীর্ঘ সময় সচেতন থাকে। চিকিৎসকদের মতে, অক্সিজেন না পেলে মস্তিষ্কের কোষ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই স্থায়ী ক্ষতি শুরু হয়। তাই জরুরি অবস্থায় দ্রুত সিপিআর বা ডিফিব্রিলেশন দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মৃত্যুর আইনি ও চিকিৎসাগত সংজ্ঞাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক দেশে “ব্রেন ডেথ” বা মস্তিষ্ক-মৃত্যুকে প্রকৃত মৃত্যু হিসেবে ধরা হয়—যেখানে মস্তিষ্কের সব কার্যকলাপ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়, যদিও কৃত্রিমভাবে হৃদযন্ত্র কিছু সময় চালু রাখা সম্ভব। অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রেও এই সংজ্ঞা প্রযোজ্য।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মৃত্যু একটি একক মুহূর্ত নয়, বরং একটি প্রক্রিয়া। হৃদস্পন্দন থামা সেই প্রক্রিয়ার শুরু হতে পারে, কিন্তু মস্তিষ্কের সম্পূর্ণ নীরবতা ঘটে কিছুটা পরে। সাম্প্রতিক গবেষণা আমাদের বুঝতে সাহায্য করছে, জীবন ও মৃত্যুর সীমানা আগের ধারণার চেয়ে আরও জটিল।
বিজ্ঞান যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—মৃত্যু শুধু হৃদয়ের থেমে যাওয়া নয়, বরং পুরো শরীর ও মস্তিষ্কের সমন্বিত কার্যকলাপের চূড়ান্ত সমাপ্তি। আর সেই সমাপ্তির ঠিক আগের মুহূর্তগুলো এখনো রহস্যে মোড়া।
