আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইরানের উপর হামলার আসল কারণ খোলসা করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের তেলের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায় আমেরিকা। লক্ষ্যপূরণে খার্গ দ্বীপে মার্কিন বাহিনীর মোতায়েনের সম্ভাবনারও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

রবিবার 'ফিন্যান্সিয়াল টাইমস'-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, "সত্যি বলতে কী, আমার সবচেয়ে পছন্দের বিষয় হল ইরানের তেল দখল করে নেওয়া। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরই কিছু বোকা লোক প্রশ্ন তুলছে। আমার তাঁদের কাছে পাল্টা প্রশ্ন, আপনারা কেন এমনটা করছেন? আসলে ওরা নিতান্তই বোকা মানুষ।"

খার্গ দ্বীপ দিয়েই ইরানের তেলের সিংহভাগ রপ্তানি হয়ে থাকে। ফলে ট্রাম্পের কাছে এই দ্বীপের অবস্থানগত গুরুত্ব মোটেই অজানা নয়। ফলে ওয়াশিংটনের নজরে এখন খার্গ দ্বীপটিও। সাক্ষাৎকারে খার্গ দ্বীপের গুরুত্ব উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট জানান, সেখানে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে কিছু সময়ের জন্য মোতায়েন করা হতে পারে। ট্রাম্প বলেছেন, "পেন্টাগন বেশ কয়েকটি সামরিক বিকল্প বিবেচনা করছে। হয়তো আমরা খার্গ দ্বীপ দখল করব, আবার হয়তো করবও না। আমাদের হাতে অনেকগুলো বিকল্প রয়েছে।" তিনি আরও যোগ করেন, "এর অর্থ দাঁড়াবে যে, আমাদের সেখানে [খার্গ দ্বীপে] বেশ কিছুদিন অবস্থান করতে হবে।"

মার্কিন প্রেসিডেন্ট্রের মন্তব্যে মধ্য এশিয়ার সংঘাত আরও সঙ্কটে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারও আরও অস্থির হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্কট যত ঘনীভূত হচ্ছে, তার প্রভাবে সোমবার এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১১৬ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে। গত এক মাসে তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশেরও বেশি।

খার্গ দ্বীপে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প বলেন, "আমার মনে হয় না যে তাদের সেখানে কোনও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আছে। আমরা খুব সহজেই সেটি দখল করে নিতে পারব।"

জানা গিয়েছে যে, পেন্টাগন ইতিমধ্যেই খার্গ দ্বীপে ১০,০০০ সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছে। এইসব মার্কিন সেনারা স্থলভাগ দখল এবং তা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার কাজে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত। শুক্রবার প্রায় ৩,৫০০ সেনা (যাদের মধ্যে ২,২০০ জনই নৌসেনা) এই অঞ্চলে এসে পৌঁছেছেন। এছাড়া আরও ২,২০০ নৌসেনা বর্তমানে এই অঞ্চলের পথে রয়েছেন। ওয়াশিংটন যখন সম্ভাব্য বিস্তৃত সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের আরও হাজার হাজার সেনাকে মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

খার্গ দ্বীপে আমেরিকার যেকোনও ধরনের হামলা চালানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে বলে মত সামরিক বিশেষজ্ঞদের। এর ফলে মার্কিন সেনাদের হতাহত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যাবে এবং সংঘাতের মেয়াদ দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। পাশাপাশি এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ পথটিকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে দেবে।

এই সংঘাতের পরিধি ইতিমধ্যেই ইরান ও ইজরায়েলের সীমানা ছাড়িয়েছে। শুক্রবার সৌদি আরবে অবস্থিত আমেরিকার একটি বিমান ঘাঁটিতে ইরানের চালানো হামলায় ১২ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন এবং ২৭ কোটি ডলার মূল্যের একটি 'ই-৩ সেন্ট্রি 'নজরদারি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা ইpরায়েল লক্ষ্য করে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও ছুঁড়েছে। যা মদ্য এশিয়ার সংঘাতে আশঙ্কার মেঘ আরও ঘন করেছে। উদ্বেগ বাড়ছে জ্বালানি সঙ্কট নিয়ে।

সামরিক হুমকি থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প জানিয়েছেন যে, পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেহরানের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা বেশ ভালভাবেই এগিয়ে চলছে। তিনি বলেন, "যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে চুক্তি রাজি হওয়ার জন্য তিনি ইরানকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। এর মধ্যে রাজি না হলে ইরানের জ্বালানি পরিকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।"

যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে ট্রাম্প বিস্তারিত কিছু জানাতে চাননি। তিনি বলেন: “আমাদের হাতে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে আর প্রায় ৩,০০০ জায়গা বাকি আছে। আমরা এর মধ্যেই ১৩,০০০ লক্ষ্যবস্তুতে বোমা হামলা চালিয়েছি এবং আরও কয়েক হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো বাকি রয়েছে।” তবে তিনি আশাবাদী যে, “খুব দ্রুতই একটি চুক্তি সম্পন্ন করা সম্ভব হতে পারে।”

ট্রাম্প আরও দাবি করেন যে, আলোচনার এই পর্যায়ে সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে ইরান পাকিস্তানের পতাকাবাহী আরও বেশ কিছু তেল ট্যাঙ্কারকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদে যাতায়াতের অনুমতি দিয়েছে। প্রেসিডেন্টের কথায়,  “তারা (ইরান) প্রথমে আমাদের ১০টি ট্যাঙ্কারকে অনুমতি দিয়েছিল। এখন তারা ২০টি ট্যাঙ্কারকে অনুমতি দিচ্ছে। এই ২০টি ট্যাঙ্কারের যাতায়াত ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে এবং সেগুলো হরমুজ প্রণালীর ঠিক মাঝখান দিয়েই যাতায়াত করছে।” তিনি আরও জানান যে, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাঘের গালিবাফ ব্যক্তিগতভাবে এই ব্যবস্থার অনুমোদন দিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন: “তিনিই (মহম্মদ বাঘের গালিবাফ) সেই ব্যক্তি, যিনি আমার জন্য জাহাজগুলোর চলাচলের অনুমোদন দিয়েছেন।”

ট্রাম্প আরও যুক্তি দেন যে, যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই এবং বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ইরানে কার্যত একটি “শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন” ঘটে গিয়েছে। ইরানের নতুন নেতৃত্বের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেন: “আমরা বর্তমানে যাঁদের সঙ্গে আলোচনা করছি, তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গোষ্ঠী... [তারা] অত্যন্ত পেশাদার।”

প্রেসিডেন্ট তাঁর আগের দাবিও ফের তুলে ধরেন। জানিয়েছেন, প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার পুত্র এবং তেহরানের বর্তমান সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী মোজতবা খামেনেই হয়তো মারা গিয়েছেন কিংবা গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। তিনি বলেছেন, “ওই পুত্রসন্তানটি হয়তো মারা গিয়েছেন, নতুবা তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। আমরা কোনও খবরই পাইনি। তিনি বর্তমান দৃশ্যপট থেকে পুরোপুরি হারিয়ে গিয়েছেন।”