আজকাল ওয়েবডেস্ক: জল মাপতে চাইছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট? ইরানের শক্তি পরিকাঠামোগুলোর উপর হামলার সময়সীমা পিছিয়ে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত পিছিয়ে দিলেন ডোনাল্ট ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার এই ঘোষণা করেছেন তিনি। ট্রাম্পের দাবি, তেহরানের অনুরোধেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং আলোচনা "খুবই ভালভাবে এগিয়ে চলছে।" পাল্টা ইরান ট্রাম্পের দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলা বন্ধের কোনও অনুরোধ জানানো হয়নি।
মার্কিন শান্তি পরিকল্পনার প্রস্তাবে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান তেমনু আগ্রহী নয়। তা সত্ত্বেও, মধ্য এশিয়ার যুদ্ধ অবসানে একটি চুক্তির জন্য তিনি মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এমন অভিযোগ আগেই ট্রাম্প উড়িয়ে দিয়েছেন।
নিজের 'ট্রুথ সোশ্যাল' প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্প লিখেছেন, "আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এবং 'ফেক নিউজ মিডিয়া' (ভুয়া সংবাদমাধ্যম) ও অন্যদের পক্ষ থেকে এর পাল্টা ভুল বিবৃতি দেওয়া হলেও, আলাপ-আলোচনা আসলে খুবই ভালভাবে এগিয়ে চলছে।"
তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোর চলাচলের জন্য 'হরমুজ প্রণালী' খুলে দিতে গত শনিবার ট্রাম্প প্রাথমিকভাবে ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। অন্যথায় তাঁর হুঁশিয়ারি ছিল, মার্কিন বাহিনী ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে দেবে। তবে এখন তিনি সেই সময়সীমা আরও ১০ দিন বাড়িয়ে দিলেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও একটি পোস্টে লিখেছেন, "ইরান সরকারের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে, এই বিবৃতিটির মাধ্যমে আমি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করছি যে - জ্বালানি পরিকাঠামোগুলো ধ্বংস করার নির্ধারিত সময়সীমা আমি ১০ দিনের জন্য স্থগিত করছি। এই স্থগিতাদেশ সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০২৬-এর রাত ৮টা (ইস্টার্ন টাইম) পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।"
এর আগে মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ জানান যে, তেহরান আলোচনার টেবিলে বসতে প্রস্তুত - এমন "শক্তিশালী ইঙ্গিত" পাওয়া গিয়েছে। তিনি প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেন যে, ওয়াশিংটন পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তেহরানের কাছে ১৫দফার একটি "কর্ম-তালিকা" হস্তান্তর করেছে।
উইটকফ বলেন, "আমরা দেখব পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়। আমরা যদি ইরানকে এটা বোঝাতে সক্ষম হই যে - এই সময়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ এবং মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞ ছাড়া তাদের সামনে আর কোনও ভালো বিকল্প পথ খোলা নেই - তবেই আমরা সফল হব।"
এদিকে, ইরানের সংবাদ সংস্থা 'তাসনিম' এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে: "আমেরিকার প্রস্তাবিত ১৫-দফা তালিকার প্রতি ইরানের আনুষ্ঠানিক জবাব গত রাতে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ইরান অপর পক্ষের উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে।"
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে তাসনিমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের জবাবে আমেরিকা ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইরানের ভূখণ্ডে এবং এই অঞ্চলের অন্যান্য স্থানে তেহরান-মদতপুষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠীর ওপর চালানো হামলা বন্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে। এখানে মূলত লেবাননের 'হিজবুল্লাহ'সহ অন্যান্য গোষ্ঠীর কথাই উল্লেখ করা হয়েছে।
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ইরানের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের "সার্বভৌমত্বকে" অবশ্যই সম্মান জানাতে হবে বলেও শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এই শর্তগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তেহরানের দাবি-দাওয়াগুলো যুআমেরিকার প্রস্তাবিত পরিকল্পনার আওতাভুক্ত বিষয়গুলোর চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত ও সুদূরপ্রসারী।
সেনাসংখ্যা অত্যন্ত কম
হোয়াইট হাউসে টেলিভিশনে প্রচারিত এক বৈঠকে, ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে বারবার "সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার" হুমকি দেওয়া এবং ইরান ইতিমধ্যেই আত্মসমর্পণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছে - এমন দাবি করার মধ্যে বারবার অবস্থান পরিবর্তন করছিলেন। প্রেসিডেন্ট বলেছেন, "তারা একটি চুক্তি করতে চায়। এর কারণ হল, তারা চরমভাবে পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছে।" ট্রাম্প আরও বলেন যে, আমেরিকা হয়তো ইরানের তেলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে। এ প্রসঙ্গে তিনি নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ভেনেজুয়েলার সঙ্গে ওয়াশিংটনের করা চুক্তির তুলনা টানেন।
ইজরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ ইতিমধ্যেই তাঁর দেশের সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে বলেনছেন যে, এই যুদ্ধের (মধ্য এশিয়া) মূল্য অত্যন্ত চড়া হচ্ছে। তার মধ্যেই ট্রাম্পের এই কঠোর বার্তা বেশ তাৎপর্যবাহী।
ইয়ার লাপিদ বলেছেন, "আইডিএফ (ইজরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস)-এর ওপর চাপ এখন সহনসীমার শেষ প্রান্তে, এমনকি তারও বাইরে চলে গিয়েছে। সরকার আহত সেনাদের যুদ্ধক্ষেত্রেই ফেলে রাখছে।" এর মাধ্যমেই তিনি ইজরায়েলি সামরিক প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আইয়াল জামির-এর আগের দিন দেওয়া সতর্কবার্তাই প্রতিধ্বনিত করেন। তিনি আরও বলেন যে, "সরকার সেনাবাহিনীকে কোনও সুনির্দিষ্ট কৌশল ছাড়াই, প্রয়োজনীয় রসদপত্র ছাড়াই এবং অত্যন্ত নগণ্য সংখ্যক সেনা নিয়ে বহু-মুখী এক যুদ্ধে ঠেলে দিচ্ছে।"
টেলিভিশনে প্রচারিত এক ব্রিফিংয়ে ইজরায়েলি সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডেফ্রিন বলেন: "লেবানন সীমান্তে আমরা যে অগ্রবর্তী প্রতিরক্ষাবলয় গড়ে তুলছি, তার জন্য আইডিএফ-এর অতিরিক্ত সেনাসদস্য প্রয়োজন। আর সেই কারণেই আইডিএফ-এ আরও বেশি সংখ্যক যুদ্ধসেনার প্রয়োজন।"
'ফিরে আসার কোনও পথ নেই'
মন্ত্রিসভার বৈঠকে ট্রাম্প বলেছেন, আলোচনার বিষয়ে ইরান যে আন্তরিক, তা প্রমাণ করতে তারা হরমুজ প্রণালী দিয়ে ১০টি তেল ট্যাঙ্কারকে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় প্রতিদিনই বোমাবর্ষণের শিকার ইরান বৃহস্পতিবার ইজরায়েলি হামলার এক অদ্যায়ের সম্মুখীন। ইজরায়েল দাবি করেছে, ওই হামলাগুলোর একটিতে গার্ডস বাহিনীর নৌ-কমান্ডার আলিরেজা তাংসিরি এবং বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ‘নিহত’ হয়েছেন।
পরবর্তীতে তেহরানে অবস্থানরত এএফপি-র এক প্রতিবেদক মাথার ওপর দিয়ে যুদ্ধবিমানের উড়ে যাওয়ার শব্দ এবং তিনটি বিকট বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনতে পান।
ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, দেশের মধ্যাঞ্চলের শহর ইসফাহান ও শিরাজ, দক্ষিণের বন্দর আব্বাস এবং উত্তর-পশ্চিমের তাবরিজে আমেরিকা ও ইজরায়েলের হামলা হয়েছে। এছাড়া আফগান সীমান্তের দিকে অবস্থিত মাশহাদ ও বিরজান্দেও হামলা চালানো হয়েছে। এইসব এলাকাগুলোতে এতদিন যুদ্ধের সরাসরি আঁচ পড়েনি।
বন্দর আব্বাসের উপকূলের অদূরে উপসাগরীয় অঞ্চলের বৃহত্তম ইরানি দ্বীপ ‘কেশম’-এর এক বাসিন্দা টেলিগ্রামের মাধ্যমে এএফপি-কে জানান, তিনি আশা করছেন সামরিক বাহিনী যেন ওই এলাকাটি দখল করে না নেয়। ৪২ বছর বয়সী সাদেক বলেন, “মানুষের দুর্ভোগ, দারিদ্র্য এবং রাজনৈতিক নিপীড়ন - সবকিছুই প্রতি বছর আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “আমি মনে করি না যে যুদ্ধই এই পরিস্থিতির একমাত্র সমাধানষ। তবে যুদ্ধ থেমে গেলেও আমাদের জীবনে খুব একটা পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয় না।”
উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। আবুধাবির কাছেই একটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সময় সেটির ধ্বংসাবশেষের আঘাতে দু'জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া সৌদি আরব ও কুয়েতের দিকেও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
উপসাগরীয় যেসব দেশকে গাঁটি করে আমেরিকা হামলা চালাচ্ছে, ইরান সেগুলোকে নিসানা করেছে।
এরক মধ্যেই গত সপ্তাহ থেকে অপরিশোধিত তেলের দাম কিছুটা কমে এলেও, আলোচনা সংক্রান্ত দোদুল্যমান ও অস্পষ্ট বার্তাগুলোর প্রভাবে বৃহস্পতিবার তেলের দাম আবারও বেড়েছে।















