আজকাল ওয়েবডেস্ক: ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রথমবার হোয়াইট হাউসে পা রাখেন, তখন অনেকেরই ধারণা ছিল যে তার উগ্র স্লোগান বা আক্রমণাত্মক ভাষা হয়তো মার্কিন বিশ্বশক্তির মূল ভিত্তিকে নাড়াতে পারবে না। কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার পর মাত্র ১৫ মাসের মধ্যে দেখা যাচ্ছে, এক সময়ের 'আমেরিকা ফার্স্ট' বা 'অন্তহীন যুদ্ধ বন্ধ করার' প্রতিশ্রুতি দেওয়া ট্রাম্প এক পুরোদস্তুর যুদ্ধবাজ নেতায় পরিণত হয়েছেন। সম্প্রতি ‘দ্য ওয়্যার’-এ প্রকাশিত একটি বিশেষ প্রতিবেদনে ট্রাম্পের এই রাজনৈতিক বিবর্তনকে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের শিক্ষা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের এই রূপান্তর আসলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতার এক নিষ্ঠুর পাঠ। গত ১৫ মাসে তার প্রশাসন সোমালিয়া, ইরাক, ইয়েমেন, নাইজেরিয়া এবং সিরিয়াতে সামরিক অভিযান সম্প্রসারণ করেছে। এমনকি ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে নাটকীয়ভাবে অপহরণ এবং ইজরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে সমন্বিত হামলার মতো ঘটনাও ঘটেছে। যে ট্রাম্প একসময় নিও-কনজারভেটিভদের যুদ্ধের নেশাকে উপহাস করতেন, আজ তিনিই সামরিক শক্তিকে ক্ষমতার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।
সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় বিষয় হল ট্রাম্পের ভাষার পরিবর্তন। ইরানের অনমনীয় জেদের সামনে যখন তার ‘আর্ট অফ দ্য ডিল’ বা সমঝোতার কৌশল ব্যর্থ হচ্ছে, তখন তার ভাষা হয়ে উঠছে আরও বেশি অসংলগ্ন ও কুরুচিপূর্ণ। ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে তার পোস্টগুলো এখন আক্রমণাত্মক ও গালিগালাজে পূর্ণ। তিনি প্রতিপক্ষকে ‘পাগল’ বলে গালি দিচ্ছেন এবং প্রয়োজনে পুরো সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার মতো হুমকি দিচ্ছেন।
এই পরিবর্তন ট্রাম্পের নিজের সমর্থক গোষ্ঠীর (MAGA base) মধ্যেও ফাটল ধরিয়েছে। টাকার কার্লসন, মার্জোরি টেলর গ্রিন বা ক্যান্ডেস ওয়েন্সের মতো পরিচিত মুখগুলো যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, ট্রাম্প তখন তাদের ‘লুজার’ বা ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে দাগিয়ে দিচ্ছেন। এমনকি দীর্ঘদিনের মিত্র এরিক প্রিন্সকেও তিনি রেয়াত করছেন না। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যখনই ট্রাম্পের তথাকথিত দেশীয় বা আন্তর্জাতিক নীতি বাধার মুখে পড়ছে, তখনই তিনি যুক্তি ছেড়ে ব্যক্তিগত আক্রমণের পথ বেছে নিচ্ছেন।
আসলে এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, পপুলিস্ট বা জনমোহিনী নেতারা যখন সাম্রাজ্যবাদী প্রশাসনিক যন্ত্রের উত্তরাধিকারী হন, তখন তারা সেটি ভেঙে ফেলার বদলে উল্টো সেই ব্যবস্থারই অংশ হয়ে যান। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা আমলাতন্ত্র এবং সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সের যে অমোঘ টান, ট্রাম্প এখন তারই শিখণ্ডী। ইরানের বিরুদ্ধে তার এই কঠোর অবস্থান আসলে তার ‘ফিনিশিং স্কুল’ বা শেষ পাঠের মতো, যেখানে বাস্তবতা তাকে নিজেরই পুরোনো আদর্শের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত এই সামরিক আগ্রাসন ট্রাম্পকে স্বল্পমেয়াদে শক্তিশালী দেখাতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি আমেরিকার জন্য কৌশলগত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সাম্রাজ্যের ইতিহাস বলে, ক্ষমতার দম্ভ যখন বাস্তবতার দেয়ালে ধাক্কা খায়, তখন তা কেবল আস্ফালনেই সীমাবদ্ধ থাকে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদেও তার ব্যতিক্রম ঘটছে না, বরং তার বিষাক্ত ভাষণ আর সামরিক আস্ফালন মার্কিন রাজনীতির অভ্যন্তরীণ বিভেদকেই আরও প্রকট করে তুলছে।















