আজকাল ওয়েবডেস্ক: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো এমন ভাষায় মন্তব্য করলেন, যাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তাঁর প্রতি তুষ্ট ও অনুগত এক নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ওয়াশিংটনে হাউস রিপাবলিকান সদস্যদের নীতি-সংক্রান্ত এক বৈঠকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ট্রাম্প দাবি করেন, ভারত সরকার দ্রুত ৬৮টি অ্যাপাচি যুদ্ধহেলিকপ্টার সরবরাহের জন্য তাঁর দপ্তরের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, “ভারত ৬৮টি অ্যাপাচি অর্ডার করেছিল। প্রধানমন্ত্রী মোদি আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। বললেন,‘স্যার, আমি কি আপনাকে একটু দেখতে পারি?’” এরপর ট্রাম্প নিজেই জবাব দেওয়ার ভঙ্গিতে বলেন, “হ্যাঁ।” বক্তব্যের মাঝে খানিকটা কর্তৃত্বপূর্ণ সুরে তিনি যোগ করেন, “ওর সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুব ভালো।”
তবে ট্রাম্পের এই দাবির সঙ্গে ভারতের সরকারি নথি এবং সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টের গুরুতর অমিল রয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া-র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত মোট ২৮টি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার অর্ডার করেছিল এবং গত বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই সবকটির সরবরাহ সম্পন্ন হয়েছে। অর্থাৎ ট্রাম্প যে ৬৮টি হেলিকপ্টারের কথা বলছেন, তার কোনও সরকারি প্রমাণ নেই।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য নতুন নয়। ২০১৯ সালেও সিএনএন একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে দেখিয়েছিল, ট্রাম্প যখন বিদেশি নেতাদের মুখে বারবার ‘স্যার’ শব্দটি ব্যবহার করেন, তখন তা অনেক সময় বাস্তব ঘটনার চেয়ে তাঁর নিজের বানানো বর্ণনার দিকেই ইঙ্গিত করে।
এদিন ট্রাম্প বর্তমান ভারত-মার্কিন সম্পর্ক নিয়েও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “ও এখন খুব খুশি নয় আমার ওপর। কারণ, এখন ওদের অনেক শুল্ক দিতে হচ্ছে। কারণ ওরা রাশিয়া থেকে তেল নিচ্ছিল। যদিও এখন সেটা অনেকটাই কমিয়েছে।” ট্রাম্প এই মন্তব্য এমন এক সময়ে করলেন, যখন তাঁর প্রশাসন ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ চলাকালীন রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানির জন্য ভারতের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ ‘পেনাল্টি ট্যারিফ’ চাপিয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, এই শুল্ক আরোপ আগের থেকেই চালু থাকা ২৫ শতাংশ মার্কিন শুল্কের ওপর অতিরিক্ত। এখনও পর্যন্ত ভারত ও আমেরিকার মধ্যে কোনও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি সই হয়নি।
ট্রাম্প দাবি করেন, শুল্ক আরোপের ফলে আমেরিকা বিপুল আর্থিক লাভ করছে। তাঁর কথায়, “আমরা শুল্কের কারণে ধনী হয়ে যাচ্ছি। মিডিয়া এটা বলতে চায় না। খুব শিগগিরই আমাদের দেশে ৬৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ ঢুকবে।”
এর আগে, ৪ জানুয়ারি এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময়ও ট্রাম্প একই সুরে মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “ভারত আমাকে খুশি করতে চেয়েছিল। মোদি জানত আমি খুশি নই, আর আমাকে খুশি করাটা গুরুত্বপূর্ণ।”
এই রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি বাস্তব অর্থনৈতিক চিত্র কিছুটা ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। দ্য হিন্দু পত্রিকার এক প্রতিবেদনে সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ভারতের রাশিয়ান তেল আমদানি গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছায়—পরিমাণ ও মূল্যমানে উভয় ক্ষেত্রেই। তবে অন্যদিকে, ভারতের বৃহত্তম বেসরকারি রিফাইনারি সংস্থা রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ জানিয়েছে, জানুয়ারি মাসে তারা কোনও রাশিয়ান অপরিশোধিত তেল আমদানি করবে না। রয়টার্সের মতে, এর ফলে চলতি মাসে ভারতের রাশিয়ান তেল আমদানি কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের বক্তব্যে একদিকে যেমন ব্যক্তিগত সম্পর্কের নাটকীয় বর্ণনা রয়েছে, তেমনই অন্যদিকে ভারত-মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্ক, শুল্কনীতি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে জটিল কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
