আজকাল ওয়েবডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে কি তবে যুদ্ধের মেঘ কাটতে শুরু করেছে? গত কয়েকদিনের চরম উত্তেজনার পর সোমবার এক নাটকীয় মোড় নিল আমেরিকা-ইরান সংঘাত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং জ্বালানি পরিকাঠামোয় পরিকল্পিত সবরকম সামরিক হামলা আপাতত স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্পের দাবি, তেহরানের সঙ্গে আমেরিকার "গভীর ও গঠনমূলক" আলোচনা চলছে, যার লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের শত্রুতার অবসান ঘটানো। যদিও ওয়াশিংটনের এই দাবিকে নস্যাৎ করে দিয়ে ইরান একে আমেরিকার 'পিছু হটা' হিসেবেই বর্ণনা করছে।

সোমবার নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ (Truth Social) পরপর কয়েকটি পোস্টে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, গত দুই দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। তিনি লেখেন, "আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের শত্রুতা সম্পূর্ণ কমানোর লক্ষ্যে গত দুই দিন ধরে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে বিস্তারিত ও গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে।"

এই আলোচনার প্রেক্ষিতেই তিনি মার্কিন ‘ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার’-কে নির্দেশ দিয়েছেন যাতে আগামী পাঁচ দিনের জন্য ইরানের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে কোনও  রকম হামলা চালানো না হয়। তবে ট্রাম্প এও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই স্থগিতাদেশ সাময়িক এবং তা নির্ভর করবে চলতি সপ্তাহে হতে চলা আলোচনার সাফল্যের ওপর। উল্লেখ্য, এর মাত্র দু’দিন আগেই ট্রাম্প ইরানকে একটি "সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র" হিসেবে অভিহিত করে হুঙ্কার দিয়েছিলেন যে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং প্রতিরক্ষা শিল্প পুরোপুরি ধ্বংস না করা পর্যন্ত আমেরিকা থামবে না।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আলোচনার দাবি করলেও, তেহরান কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা 'ফার্স' (Fars) এক সূত্রকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনও  ধরনের যোগাযোগই হয়নি। বরং ইরানের দাবি, তেহরান যদি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি না দিত যে—আমেরিকা হামলা করলে তারা পুরো পশ্চিম এশিয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে পালটা আঘাত হানবে, তবে ট্রাম্প এই পিছু হটার সিদ্ধান্ত নিতেন না।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের পর্দায় বড় বড় হরফে লেখা হয়েছে, "ইরানের কঠোর সতর্কবার্তার মুখে নতিস্বীকার করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।" ইরানের বিদেশমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি সাফ জানিয়েছেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ 'হরমুজ প্রণালী' (Strait of Hormuz) তাঁরা পুরোপুরি বন্ধ করেননি, তবে শত্রুভাবাপন্ন দেশের জাহাজ চলাচলের জন্য সেখানে কোনও  জায়গা নেই।

এই অস্থির পরিস্থিতির মাঝে ব্রিটেন এবং ন্যাটোর (NATO) মতো আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, তাঁরা আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে আলোচনার খবরকে স্বাগত জানাচ্ছেন। ব্রিটিশ প্রশাসনের মতে, হরমুজ প্রণালী ফের খুলে দেওয়া এবং দ্রুত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক স্বার্থে জরুরি। অন্যদিকে, ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক রুটে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২২টি দেশ একযোগে কাজ করতে প্রস্তুত।

ট্রাম্পের এই পাঁচ দিনের 'ডেডলাইন' বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আসলে কোনো কূটনৈতিক জয়ের ইঙ্গিত নাকি যুদ্ধের ময়দানে নতুন কোনও  কৌশলের অংশ, তা নিয়ে ধন্দ কাটছে না। একদিকে ট্রাম্প বলছেন "শক্তির মাধ্যমে শান্তি" (Peace through strength), অন্যদিকে ইরান তাদের জলসীমায় মাইন পুঁতে রাখার এবং স্থল সেনাদের প্রতিহত করার প্রস্তুতি জারি রেখেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী এক সপ্তাহ বিশ্ব রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি এই পাঁচ দিনে কোনও  সুনির্দিষ্ট সমাধানে পৌঁছানো না যায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই আগুন জ্বালানি সংকট থেকে শুরু করে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।