আজকাল ওয়েবডেস্ক: বাঘেদের উপোষ! প্রায় ২০০ বাঘের জন্য দীর্ঘসময়ের বিরতিহীন উপোষ কর্মসূচীর সিদ্ধান্ত নিয়েছে চীনের হেইলংজিয়াং প্রদেশের সাইবেরিয়ান টাইগার পার্ক কর্তৃপক্ষ। কেন এমন 'শাস্তি'? টাইগার পার্ক কর্তৃক্ষের দাবি, বিগত কয়েক দিনে পার্কে দর্শনার্থীরদের ভিড় হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিল। তারা বাঘগুলোকে খেতে দিতেন। এতেই বাঘদের অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণ হয়েছে। তার জেরেই এবার বাঘেদের উপোষের সিদ্ধান্ত।
চীনের বসন্ত উৎসব উপলক্ষে পার্কে দর্শনার্থীর সংখ্যা হঠাৎ করে বৃদ্ধি পায়। ১৭ ফেব্রুয়ারি আসেন ৭,৭০৮ জন দর্শনার্থী। তবে রেকর্ড গড়ে তোলে ১৮ ফেব্রুয়ারির ভিড়। যেন জনসমুদ্র। দর্শনার্থীর সংখ্যা ছাড়ায় ১০,০০০। একানে দর্শকরা বাঘেদের মাংস খাওয়াতে পারেন। বিপুল দর্শক সংখ্যার কারণে বাঘেরাও বেশি মাংস খেতে পায়। পার্ক কর্তৃপক্ষের মতে, এই অতিরিক্ত খাবারই বাঘদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ- এই দু'মাসের জন্য বাঘেদের রোটেশনাল উপবাস পরিকল্পনা চালু করা হয়েছে।
প্রায় ৮,০০,০০০ বর্গমিটার জায়গাজুড়ে অবস্থিত এই পার্কটি চীনের জাতীয় পর্যটন কেন্দ্র। পর্যটনের পাশাপাশি এখানে ব্যাঘ্র-প্রজনন, বাঘ বিষয়ে গবেষণা, বাঘের সংরক্ষণ ইত্যাদ বিষয়েও হয়ে থাকে। ফলত হেইলংজিয়াং প্রদেশের সাইবেরিয়ান টাইগার পার্ক শুধুমাত্র চিড়িয়াখানা নয়- সংরক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত।
কীভাবে বাঘেদের উপোষ? পার্কে মোট ১১টি ফ্রি-রেঞ্জ এনক্লোজার বা ভাগ রয়েছে। প্রতিদিন এনক্লোজারের মধ্যে থাকা বাঘেদের মধ্যে কয়েকটিকে বেছে তৈরি হয় উপোষের তালিকা। সেই বাঘগুলোকে নির্দিষ্ট দিনে, দর্শনার্থীদের দেওয়া মাংস খাওয়ানোর বিষয়টি বন্ধ রাখা হয়। পরদিন অন্য এনক্লোজারে একই নিয়ম কার্যকর হয়। এভাবে উপোষের সময়সীমা সব বাঘের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করা হয়। ফলে বাঘের শরীর ঠিক থাকে। কর্তৃপক্ষ-এর দাবি, এভাবে তাঁড়া নিয়ন্ত্রিত খাদ্যব্যবস্থার মাধ্যমে প্রাণীদের স্বাস্থ্য রক্ষা করেন।
এবার আসি বাঘের কথায়। সাইবেরিয়ান টাইগারকে আমুর টাইগারও বলা হয়, তারা একা একা শিকার করে বাঁচে, এবং শিকারী প্রাণীদের মধ্যে এরা শীর্ষস্থানীয়। এদের খাদ্য তালিকার প্রথম দিকে থাকে বুনো শুয়োর, আর হরিণের বিভিন্ন প্রজাতি, যেমন-মাঞ্চুরিয়ান ওয়াপিটি (লাল হরিণ, সিকা হরিণ, রো ডিয়ার, মাস্ক ডিয়ার ইত্যাদি। এছাড়াও তালিকায় আছে খরগোশ, পিকা, র্যা কুন ডগ ইত্যাদি। খাদ্যাভ্যাসে অন্য বাঘেদের থেকে একটা জায়গায় এই প্রজাতি আলাদা। এরা ভাল্লুকও শিকার করে। এশীয় ব্ল্যাক বিয়ার, উসুরি ব্রাউন বিয়ার ইত্যাদি ভাল্লুকেরা, এই বাঘেদের খাদ্য তালিকায় দুই থেকে তিন শতাংশ জায়গা নিয়ে রয়েছে। কখনও কখনও স্বাদ বদলের জন্য খায় স্যামন মাছ, কচ্ছপ, পাখি, ব্যাঙ, টিকটিকি ইত্যাদি।
এদের প্রতিদিন গড়ে ন’কেজি মাংস প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু প্রতিদিন তারা শিকার করে না। একবার একটা সফল শিকারের পর তারা ২৭–৫০ কেজি পর্যন্ত একসঙ্গে খায়। ফলে, সাধারনত বছরে ৫০-৬০টি শিকার করলেই তাদের বছর গড়িয়ে যায় অনায়াসে। এক একটা শিকার তারা তিন থেকে চার দিন ধরে খায়। অর্থাৎ প্রকৃতিতে বাস করার সময়ে তারা নিয়মিত উপোষে অভ্যস্ত থাকে। এক দিন খাওয়া দাওয়া করে তারা টানা তিন চার দিইন না খেয়েও কাটায় অনেক সময়ে।
প্রকৃতিতে সাইবেরিয়ান টাইগাররা অনিয়মিত খাদ্যচক্রে অভ্যস্ত। শিকার নির্ভর জীবনে মাঝে মাঝে উপোষ স্বাভাবিক। তাই নিয়ন্ত্রিত ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে যদি খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তাহলে তা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হওয়ার কথা নয়। বরং অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ রোধ করাই মূল লক্ষ্য। তবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, এটা কি পুরোপুরি প্রাণীকল্যাণের জন্য, নাকি পর্যটন ব্যবস্থাপনার ভারসাম্য রক্ষার অংশ? বাস্তবে দু'টোই এখানে জড়িয়ে আছে।
চীনের এই সাইবেরিয়ান টাইগারদের জন্য চালু হওয়া এই রোটেশনাল উপবাস কর্মসূচি একদিকে পর্যটন-চাপ নিয়ন্ত্রণের প্রয়াস, অন্যদিকে প্রাণীস্বাস্থ্যের সুরক্ষার বিষয়টিকে সামনে এনেছে। প্রকৃতিতে বাঘদের খাদ্যচক্র অনিয়মিত ও শিকারনির্ভর হওয়ায়, সঠিকভাবে পরিচালিত উপোষ তাদের জন্য অস্বাভাবিক নয়। তবে মনে রাখা জরুরি, বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আচরণ আর পর্যটনকেন্দ্রিক বন্দি পরিবেশের বাস্তবতা এক নয়। তাই এমন সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
কিন্তু শেষে প্রশ্নটা হল যে, আমরা কী বাঘদের প্রকৃতির মাঝে রাখতে চাই, নাকি দর্শনার্থীদের মনোরম অভিজ্ঞতাকে আগ্রাধিকার দেব?
