আজকাল ওয়েবডেস্ক: আফগানিস্তানে তালিবান সরকারের সঙ্গীতবিরোধী অবস্থান আরও একবার প্রকাশ্যে এল। পারওয়ান প্রদেশে প্রায় ৫০০টি বাদ্যযন্ত্র পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। পাশাপাশি প্রতিবেশী লাগমান প্রদেশেও ১০০টির বেশি বাদ্যযন্ত্র ধ্বংসের খবর মিলেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে উদ্বেগ ও আতঙ্কের আবহ তৈরি হয়েছে।

তালিবান নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যম Afghanistan National Television মঙ্গলবার জানায়, পারওয়ান প্রদেশে নৈতিকতা রক্ষা পুলিশের সদস্যরা গত এক বছরে প্রাদেশিক কেন্দ্র ও আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসব বাদ্যযন্ত্র বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। পরে প্রশাসনের একটি বিশেষ কমিটি সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

পারওয়ানের নৈতিকতা দপ্তরের কর্মকর্তা আবদুল মুজিব হানাফি জানান, পুড়িয়ে দেওয়া বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে ছিল হারমোনিয়াম, তবলা, তম্বাক, দফ, লাউডস্পিকারসহ বিভিন্ন ধরনের সাউন্ড সিস্টেম। তিনি আরও বলেন, এর আগেও প্রদেশটিতে শত শত বাদ্যযন্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “সঙ্গীত সমাজকে বিভ্রান্ত করে এবং নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দেয়”—এই যুক্তিতেই অভিযান চালানো হচ্ছে।

২০২১ সালের আগস্টে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই তালিবান প্রশাসন আফগানিস্তানে সঙ্গীত উৎপাদন, সম্প্রচার ও শোনার ওপর কার্যত নিষেধাজ্ঞা জারি করে। সরকারি নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগে গত চার বছরে বহু মানুষকে আটক করা হয়েছে। স্থানীয় শিল্পী, সাউন্ড টেকনিশিয়ান এবং অনুষ্ঠান আয়োজকদের ওপরও চাপ বাড়ানো হয়েছে। হাজার হাজার বাদ্যযন্ত্র ও সাউন্ড সিস্টেম ইতিমধ্যেই ধ্বংস করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

শুধু বাদ্যযন্ত্র বাজেয়াপ্ত ও ধ্বংসেই থেমে নেই প্রশাসন। সারা দেশে হোটেল ও বিবাহ অনুষ্ঠানস্থলের মালিকদের সতর্ক করা হয়েছে, যেন কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানে গান-বাজনা না হয়। তালিবান নেতৃত্ব সঙ্গীত চর্চা ও পরিবেশনাকে শরিয়াহ আইনের পরিপন্থী বলে মনে করে। এরই অংশ হিসেবে শিক্ষা ব্যবস্থা থেকেও ফাইন আর্টস বা চারুকলা সম্পর্কিত বিভাগগুলো তুলে দেওয়া হয়েছে।

এই পদক্ষেপে আফগানিস্তানের সাংস্কৃতিক পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। বহু সঙ্গীতশিল্পী ইতিমধ্যেই দেশ ছেড়েছেন, যারা দেশে আছেন তাদের অনেকে পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন। সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো থেকেও হারিয়ে যাচ্ছে সুর ও তাল—যা একসময় আফগান সমাজজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নীতির ফলে শুধু সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল নয়, তরুণ প্রজন্মের সৃজনশীল বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে তালিবান প্রশাসন তাদের অবস্থানে অনড়। তাদের দাবি, “ইসলামি মূল্যবোধ রক্ষা” এবং “নৈতিক সমাজ গঠন” করতেই এই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পারওয়ান ও লাগমানে সাম্প্রতিক এই বাদ্যযন্ত্র পোড়ানোর ঘটনা স্পষ্ট করে দিচ্ছে—আফগানিস্তানে সঙ্গীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা কেবল প্রতীকী নয়, তা বাস্তব এবং কঠোরভাবে কার্যকর করা হচ্ছে। দেশটির সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে, তা নিয়ে তাই নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।