আজকাল ওয়েবডেস্ক: পেরুতে রাজনৈতিক অস্থিরতা যেন এখন স্থায়ী বাস্তবতা। ১৭ ফেব্রুয়ারি কংগ্রেসে স্বল্প সময়ের এক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর ৮৩ বছর বয়সি José María Balcázar কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং সেই সূত্রেই দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। তাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন হেক্টর আকুনা, মারিয়া দেল কারমেন আলভা ও এডগার রেইমুন্দো। সিদ্ধান্তটি নেয় কংগ্রেস নিজেই।
বালকাসার দায়িত্ব নিলেন মধ্য-ডানপন্থী José Jerí-এর উত্তরসূরি হিসেবে, যিনি মাত্র চার মাস ক্ষমতায় ছিলেন। প্রভাব খাটানো ও দুর্নীতির অভিযোগে তাঁর সরকার বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে অপসারণ করা হয়। জেরির আগে ক্ষমতায় ছিলেন Dina Boluarte, যিনি ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর পদচ্যুত হন।
এই অস্থিরতার শিকড় আরও গভীরে। ২০২১ সালের নির্বাচনে জয়ী বামপন্থী নেতা Pedro Castillo-কে ডানপন্থী ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক শক্তিরা সরিয়ে দেওয়ার পর দেশজুড়ে তীব্র বিক্ষোভ শুরু হয়। পেরু লিব্রে দলের সমর্থনে ক্ষমতায় আসা কাস্তিয়ো একটি গণপরিষদ গঠনের চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর অপসারণের পর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে বলুয়ার্তে দায়িত্ব নেন এবং বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নেন। ২০২২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে চলা বিক্ষোভে ৫০ জনের বেশি নিহত ও প্রায় ১,৫০০ জন আহত হন। কাস্তিয়ো বর্তমানে আটক অবস্থায় আছেন এবং নিজেকে রাজনৈতিক বন্দি বলে দাবি করছেন।
&t=6sবালকাসার হলেন ২০২১ সালের পর পেরুর চতুর্থ রাষ্ট্রপতি। গত দশ বছরে তিনি অষ্টম ব্যক্তি যিনি এই পদে বসেছেন। ২০১৬ সালে নির্বাচিত ডানপন্থী Pedro Pablo Kuczynski-এর পর ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে দ্রুতগতিতে—মার্তিন ভিসকারা, মানুয়েল মেরিনো ও ফ্রান্সিসকো সাগাস্তি—প্রত্যেকেই অল্প সময়ের জন্য দায়িত্ব পালন করেছেন। এই ধারাবাহিক পরিবর্তন রাজনৈতিক ব্যবস্থার গভীর সংকট ও বৈধতার ঘাটতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নতুন রাষ্ট্রপতি বালকাসার অতীতে বিচার বিভাগে কর্মরত ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধেও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছিল, যদিও তিনি তা অস্বীকার করে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে দাবি করেছেন। ডানপন্থী মহল ইতিমধ্যে তাঁকে আক্রমণ শুরু করেছে, কারণ তিনি একসময় Perú Libre-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী Keiko Fujimori, যিনি প্রাক্তন স্বৈরশাসক Alberto Fujimori-র কন্যা, অভিযোগ করেছেন—বালকাসারের নির্বাচনে “চরম বামপন্থীরা আবার ক্ষমতায় ফিরেছে” এবং এতে গণতন্ত্র ঝুঁকির মুখে।
তবে বালকাসার নিজেকে স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, তিনি কোনও দলের সদস্য নন এবং তাঁর সরকারে পেরু লিব্রে অংশ নেবে না। কংগ্রেসের সব গোষ্ঠীর সমর্থনেই তিনি নির্বাচিত হয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাস্তবতা হলো, তাঁর হাতে সময় খুব কম। নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট শপথ নেওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁর মেয়াদ ১৮০ দিনেরও কম। তাছাড়া পেরুর সাম্প্রতিক ইতিহাস বলছে, কংগ্রেসের সমর্থন পাওয়া মানেই নিরাপত্তা নয়—যেকোনও সময় আবারও অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
এদিকে ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলি ইতিমধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে অতীতের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, যেমন ২০২৩ সালে শিশু বিবাহ নিষিদ্ধকরণ আইনের সমালোচনা। বালকাসার বলেছেন, তাঁর লক্ষ্য শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করা এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা। জুন মাসে দ্বিতীয় দফার ভোট হওয়ার কথা।
কিন্তু জনমতের চিত্র উদ্বেগজনক। ৩৬ জন সম্ভাব্য প্রার্থী আগ্রহ দেখালেও জনসমর্থন খুবই কম। রক্ষণশীল নেতা Rafael López Aliaga বর্তমানে প্রায় ১২ শতাংশ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে আছেন, যা রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের অনাস্থা ও ক্লান্তির প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, পেরু যেন এক অন্তহীন রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তে আবদ্ধ। নতুন রাষ্ট্রপতির সামনে চ্যালেঞ্জ কেবল প্রশাসনিক নয়—বিশ্বাস পুনর্গঠন, স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখা। প্রশ্ন হলো, এই অস্থির চক্র কি ভাঙা সম্ভব? নাকি পেরুর রাজনীতি আরও এক দফা অনিশ্চয়তার দিকে এগোচ্ছে?
