আজকাল ওয়েবডেস্ক: গাজা সিটি: অক্টোবর মাসে গাজায় ঘোষিত তথাকথিত “যুদ্ধবিরতি” কার্যকর হতেই অপেক্ষা করেননি প্যালেস্টাইনের কৃষক মহাম্মদ আল-স্লাখি। ধোঁয়া-ধুলায় আচ্ছন্ন, বিধ্বস্ত গাজা সিটির আকাশরেখার নিচে তিনি ও তাঁর পরিবার ফিরে যান জেইতুনে তাঁদের জমিতে। একসময় যে ক্ষেত সবুজে ভরা ছিল, আজ সেখানে কেবল ধ্বংসস্তূপ আর নীরবতা—এমনই চিত্র উঠে এসেছে Al Jazeera–এর এক প্রতিবেদনে।

দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে গাজা উপত্যকা প্রায় বিধ্বস্ত। বাড়িঘর, গ্রিনহাউস, সেচব্যবস্থা—সবকিছুই ধসে পড়েছে। যুদ্ধ থামার পর মহাম্মদ দেখেন, তাঁর তিন হেক্টর গ্রিনহাউস চূর্ণবিচূর্ণ। সেচের নেটওয়ার্ক ধ্বংস, নয়টি কূপ, দুটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং দুটি লবণাক্ততা দূরীকরণ প্ল্যান্ট—সবই উধাও। তবু মাটি রয়ে গেছে।

স্বল্প সরঞ্জাম ও প্রায় শেষ হয়ে আসা সঞ্চয় নিয়ে পরিবারটি হাত দিয়েই  ধ্বংসাবশেষ সরাতে শুরু করে। যে ধাতু পাওয়া যায় তা উদ্ধার, ভাঙা পাইপ মেরামত, আর আবার চাষের উপযোগী করে তোলা জমি। প্রথম ফসল হিসেবে তাঁরা লাগান জুচিনি (courgettes), আশা—বসন্তের শুরুতেই হয়তো জমি আবার ফল দেবে।

কিন্তু এখন গাজায় চাষ মানেই গুলির ছায়ায় চাষ। মহাম্মদের পরিবারের একসময়ের ২২ হেক্টর জমির মধ্যে এখন মাত্র এক হেক্টরই তাঁদের নাগালে। সেই জমির কয়েকশো মিটার দূরেই ইসরায়েলি ট্যাঙ্ক দাঁড়িয়ে থাকে স্থানীয়দের “ইয়েলো লাইন”-এর ওপারে—এক বিস্তৃত বাফার জোন, যা গাজায় বিপুল কৃষিজমি গ্রাস করেছে। গুলির শব্দ এখন আর দূরের প্রতিধ্বনি নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের অংশ।

১২ ফেব্রুয়ারির এক ঘটনার কথা মনে করে মহাম্মদ জানান, সেদিন সালাহ আল-দিন সড়ক ধরে ইসরায়েলি সাঁজোয়া যান এগিয়ে এসে গুলি চালায়। দু’জন প্যালেস্তিনীয় নিহত হন। মহাম্মদ ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি ভবনের আড়ালে আশ্রয় নিয়ে ঘণ্টাখানেক লুকিয়ে থাকেন, তারপর পশ্চিমদিকে পালাতে সক্ষম হন।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত UN Food and Agriculture Organization–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার ৮০ শতাংশেরও বেশি কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৫ শতাংশেরও কম জমি এখন চাষযোগ্য। একই সঙ্গে ইসরায়েল নিরাপত্তা বাফার জোন হিসেবে গাজার প্রায় ৫৮ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে—যার বড় অংশই কৃষিজমি। অনেক প্যালেস্তিনীয় আশঙ্কা করছেন, এই বাফার জোন স্থায়ী রূপ নিতে পারে।

মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ অঞ্চলে ৭৫ বছর বয়সি ঈদ আল-তাবান একই উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁর জমি বাফার জোন থেকে মাত্র ৩০০ মিটার দূরে। যুদ্ধবিরতির পর তিনি খোলা মাঠে বেগুন রোপণ করেন, কিন্তু বাড়তি বিধিনিষেধের কারণে ফসল তোলা দুষ্কর হয়ে ওঠে।
“প্রতিদিন ভারী মেশিনগানের শব্দ শোনা যায়,” ঈদ বলেন। “আমার ছেলেরা যখন সেচ দিতে যায়, আমি শুধু প্রার্থনা করি যেন তারা জীবিত ফিরে আসে।”

৬ ফেব্রুয়ারি তাঁর প্রতিবেশী কৃষক খালেদ বারাকা জমিতে কাজ করার সময় গুলিতে নিহত হন। “তিনি সারাজীবন মাটি চাষ করেছেন,” ঈদ শান্ত গলায় বলেন। “এখন তিনি নেই।” গুলিই একমাত্র হুমকি নয়। ৭ অক্টোবর ২০২৩-এর পর থেকে গাজায় কৃষি সরঞ্জাম ও উপকরণ প্রবেশে কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে ইসরায়েল। বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ সামগ্রী—সবই নাগালের বাইরে, অনেক সময় মেয়াদোত্তীর্ণ এবং অত্যধিক দামে বিক্রি হয়। কৃষকেরা অনিশ্চিত ফসলের আশায় শেষ সঞ্চয়টুকু বাজি ধরছেন।

ঈদ সম্প্রতি তাঁর গ্রিনহাউসে টমেটো চাষে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেন। তিন মাস যত্ন নেওয়ার পর দেখা যায়, সংগৃহীত সার ও কীটনাশক কার্যকর নয়—ফসল নষ্ট। তাঁকে আবার নতুন করে রোপণ করতে হয়। ফসল টিকলেও বাজারে ভরসা নেই। গাজার বিধ্বস্ত অর্থনীতিতে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কম। কখনও সীমান্তপথ বন্ধ হয়ে যায়, কখনও সস্তা আমদানি করা পণ্যে বাজার ভরে যায়—ফলে স্থানীয় কৃষকেরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেন না।

পাইকারি ব্যবসায়ী ওয়ালিদ মিকদাদ বলেন, স্থানীয় পণ্য মান ও স্বাদে ভালো হলেও দামই শেষ কথা। মহাম্মদ অনেক সময় উৎপাদন খরচের নিচে সবজি বিক্রি করতে বাধ্য হন, যাতে পচে না যায়। “আমরা কোনও  ক্ষতিপূরণ বা সহায়তা পাইনি,” তিনি জানান। তবু তাঁরা মাঠ ছাড়েননি। “কৃষিই আমাদের জীবন ও জীবিকা,” মোহাম্মদ বলেন। “এটা আমাদের পরিচয়ের অংশ। ধ্বংস আর বিপদের মাঝেও আমরা যতটা পারি জমি পুনরায় চাষ করব।”

ঈদের কাছে চাষ কেবল পেশা নয়—উত্তরাধিকার। তাঁর দাদু ১৯৪৮ সালের নাকবার আগে বীরশেবা অঞ্চলে জমি চাষ করতেন। সেই জ্ঞান তাঁর বাবার মাধ্যমে তাঁর কাছে, এখন তাঁর নাতি-নাতনিদের কাছে পৌঁছেছে। “আমার বয়স ৭৫, তবু প্রতিদিন মাঠে কাজ করি,” তিনি বলেন। “মাটির প্রতি ভালোবাসা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যায়। তা কেড়ে নেওয়া যায় না।”

গাজায় বাড়ি ভেঙে পড়ে, সীমান্ত বদলে যায়, কিন্তু কৃষকদের নীরব প্রতিরোধ টিকে থাকে—ক্ষতবিক্ষত মাটিতে পোঁতা প্রতিটি বীজে, সূর্যের দিকে মুখ তোলা প্রতিটি সবুজ অঙ্কুরে।