আজকাল ওয়েবডেস্ক: নীল জলরাশির বুকে এক রোমাঞ্চকর অভিযানের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল বিলাসবহুল প্রমোদতরী ‘এমভি হোন্ডিয়াস’। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। গত রবিবার থেকে আফ্রিকার কেপ ভার্দে উপকূলের কাছে মাঝসমুদ্রে আটকা পড়া এই জাহাজটি অবশেষে বুধবার স্পেনের তেনেরিফের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। তবে এই যাত্রাপথ আনন্দ নয়, বরং প্রাণঘাতী হান্টাভাইরাসের আতঙ্ক এবং তিনটি নিথর দেহ। গত ১ এপ্রিল আর্জেন্টিনার দক্ষিণ প্রান্ত থেকে যাত্রা শুরু করা এই প্রমোদতরীতে প্রায় ১৫০ জন আরোহী ছিলেন, কিন্তু মাঝপথেই থাবা বসায় এই রহস্যময় ভাইরাস।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নিশ্চিত করেছে যে, সংক্রমণের ফলে এ পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে—যাদের মধ্যে একজন ডাচ দম্পতি এবং একজন জার্মান নাগরিক রয়েছেন। এছাড়া আরও আটজন যাত্রী এই ভাইরাসে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনিকা গার্সিয়া জানিয়েছেন, জাহাজটি আগামী তিন দিনের মধ্যে কানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছাবে। সেখানে থাকা ১৪ জন স্প্যানিশ নাগরিককে সরাসরি মাদ্রিদের একটি সামরিক হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হবে। এই ভাইরাসের সুপ্তিকাল বা ইনকিউবেশন পিরিয়ড প্রায় ৪৫ দিন হওয়ায় তাদের দীর্ঘমেয়াদী কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। অন্যান্য যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর সুস্থ প্রমাণিত হলে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।
তদন্তে জানা গেছে, এই সংক্রমণের মূলে রয়েছে হান্টাভাইরাসের ‘অ্যান্ডিয়ান স্ট্রেন’। দক্ষিণ আফ্রিকা এবং আর্জেন্টিনার স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, এটি সাধারণত ইঁদুরের মাধ্যমে ছড়ালেও, বিশেষ ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে মানুষের থেকে মানুষের দেহেও ছড়াতে পারে। এই আশঙ্কায় কেপ ভার্দে কর্তৃপক্ষ জাহাজটিকে তাদের বন্দরে ভিড়তে বা যাত্রীদের নামতে দেয়নি। উদ্ধারকাজ চলাকালীন এক নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যখন গুরুতর অসুস্থ দুই রোগীকে নিয়ে একটি বিশেষ বিমান নেদারল্যান্ডসের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। মরক্কো সরকার তাদের আকাশসীমায় বিমানটিকে জ্বালানি ভরার অনুমতি দিতে অস্বীকার করায় চরম বিপত্তি ঘটে। শেষ পর্যন্ত স্পেনের গ্রান ক্যানারিয়া বিমানবন্দরে বিমানটি অবতরণ করতে বাধ্য হয়। সেখানে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এক রোগীর লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম বিকল হয়ে পড়লে বিমানবন্দর থেকেই সরাসরি বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে কোনোমতে তার প্রাণ বাঁচিয়ে রাখা হয়।
জাহাজের ভেতরে থাকা যাত্রীরা বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। কাসেম হাতো নামের এক যাত্রী জানিয়েছেন যে, তারা আতঙ্কিত না হওয়ার চেষ্টা করলেও সতর্কতা তুঙ্গে। ক্যাপ্টেন নিয়মিত তাদের সব তথ্য দিচ্ছেন এবং যাত্রীরা একে অপরের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে মাস্ক পরে থাকছেন। বই পড়ে বা মুভি দেখেই তাদের সময় কাটছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অবশ্য সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছে যে, এই ভাইরাসের গণ-সংক্রমণের ঝুঁকি কোভিডের মতো অতটা বেশি নয়। তবে সেন্ট হেলেনা দ্বীপসহ জাহাজটি যে সমস্ত স্থানে নোঙর করেছিল, সেখানকার যাত্রীদের ওপর কড়া নজরদারি রাখা হচ্ছে। মাঝসমুদ্রের এই সংকট এখন আন্তর্জাতিক মহলের কাছে জনস্বাস্থ্য রক্ষার এক বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।















