আজকাল ওয়েবডেস্ক: আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ইজরায়েল ভ্রমণ করে দুই দেশের সম্পর্কের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। ইজরায়েলের ৭৮তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এই সফরে মিলেইকে দেশটির সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান 'প্রেসিডেন্ট মেডেল অফ অনার'-এ ভূষিত করা হয়। জেরুজালেমে এক জমকালো অনুষ্ঠানে ইজরায়েলি আর্জেন্টিনার দক্ষিণপন্থী প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হাভিয়ের মিলেইর হাতে এই পদক তুলে দিয়ে বলেন যে, মিলেইর নৈতিকতা এবং মানবতার বার্তা সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র বাদ দিলে মিলেই সম্ভবত ইজরায়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পশ্চিমী মিত্রে পরিণত হয়েছেন।

সফরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল 'আইজ্যাক এগ্রিমেন্টস' নামক একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষর। ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সাথে করা এই চুক্তিটি নিরাপত্তা, গোয়েন্দা সহযোগিতা, বাণিজ্য এবং এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো আধুনিক প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রেও দুই দেশের অংশীদারিত্বকে মজবুত করবে। মিলেইর মতে, ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডের অনুপ্রেরণায় তৈরি এই চুক্তি সন্ত্রাসবাদ এবং মাদক পাচারের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ লড়াইয়ের একটি পথচিত্র। এই সফরের মাধ্যমেই তিনি ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর এবং কুদস ফোর্সকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেন, যা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আর্জেন্টিনার অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করেছে। এছাড়া আগামী নভেম্বর থেকে বুয়েনস আইরেস এবং তেল আবিবের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচলের ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।

তবে এই সফর শুধু রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এতে ছিল অনেক নাটকীয়তা এবং আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া। স্বাধীনতা দিবসের মূল অনুষ্ঠানে মিলেই নিভৃতচারী শিল্পী নিনো ব্রাভোর কালজয়ী গান 'লিব্রে' গেয়ে সবাইকে চমকে দেন। শুধু তাই নয়, ইজরায়েলের ১২টি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী মশাল জ্বালানোর অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি ফের ঘোষণা করেন যে, আর্জেন্টিনার দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে সরিয়ে নেওয়া হবে—যা আর্জেন্টিনার দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি তার বক্তব্যে এক রহস্যময় সুর ধরে বলেন, যুদ্ধের জয় সেনার সংখ্যার ওপর নয়, বরং 'স্বর্গের শক্তি'র ওপর নির্ভর করে। তার মতে, আলো সবসময় অন্ধকারের ওপর জয়ী হয়, যাকে অনেকেই বর্তমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইজরায়েলের প্রতি তার নিঃশর্ত সমর্থন হিসেবে দেখছেন।

বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট গ্রহণের সময় মিলেইর একটি বক্তব্য বিশ্বজুড়ে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। নিজেকে একসময়কার অধ্যাপক হিসেবে দাবি করলেও তিনি মার্ক্সবাদকে একটি 'শয়তানি তত্ত্ব' এবং কার্ল মার্ক্সকে সরাসরি 'শয়তান উপাসক' হিসেবে অভিহিত করেন। ইতিহাসবিদ এবং পন্ডিতরা তার এই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন যে, মার্ক্স একজন নাস্তিক ছিলেন এবং মিলেইর এই দাবিতে কোনও  ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। সফরের শেষ লগ্নে ওয়েস্টার্ন ওয়ালের সামনে প্রার্থনা করে তিনি যখন দেশের পথে রওনা হন, তখন তার একটি উক্তি মানুষের মনে গভীর খটকা তৈরি করেছে। তিনি বলেন, "আমরা নির্দিষ্ট কিছু সংস্কৃতির সাথে সহাবস্থান করতে পারব না।" তার এই বক্তব্য নিয়ে আর্জেন্টিনায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে, যেখানে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন এই উগ্র জাতীয়তাবাদী সুরের প্রকৃত অর্থ আসলে কী। সব মিলিয়ে মিলেইর এই সফর প্রমাণ করেছে যে, তিনি আর্জেন্টিনাকে কেবল রাজনৈতিকভাবে নয়, বরং আদর্শগত  এবং ধর্মীয়ভাবেও ইজরায়েলের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করতে চাইছেন।