আজকাল ওয়েবডেস্ক: বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে কট্টর ইসলামপন্থী দল জামাতে ইসলামী বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নির্বাচনী ইস্তাহার প্রকাশ করেছে। “A Safe and Humane Bangladesh’s Manifesto” শীর্ষক এই ৪১ দফার ইস্তাহারে ২৬টি বিষয়কে অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইস্তাহার প্রকাশ করেন দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

ইস্তাহারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, ক্ষমতায় এলে মন্ত্রিসভায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মহিলাকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি। যদিও আসন্ন নির্বাচনে জামাত নিজে কোনও মহিলা প্রার্থী দেয়নি, তবে তাদের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক দলগুলি মহিলা প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। ইস্তাহারে মহিলাদের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি এবং মাতৃত্বকালীন সময়ে মায়ের সম্মতিতে দৈনিক কর্মঘণ্টা পাঁচ ঘণ্টায় নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।

বিদেশনীতির ক্ষেত্রে জামায়াত পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সুবিচার ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা বলেছে। ইস্তাহারে প্রথমেই বাংলাদেশের পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক মানোন্নয়নের কথা উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেশী ও নিকটবর্তী দেশগুলির তালিকায় স্পষ্টভাবে ভারত, ভুটান, নেপাল, মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও থাইল্যান্ডের নাম থাকলেও, তাৎপর্যপূর্ণভাবে চিন ও পাকিস্তানের কোনও আলাদা উল্লেখ নেই।

এছাড়া মুসলিম বিশ্বের দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা, আমেরিকা, ব্রিটেন, জার্মানি, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি, এবং আফ্রিকা, পূর্ব ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার সঙ্গে যোগাযোগ সম্প্রসারণের অঙ্গীকার করা হয়েছে। সার্ক, আসিয়ান ও রাষ্ট্রপুঞ্জের মতো আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংগঠনে বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকার কথাও বলা হয়েছে। ক্ষমতায় এলে আন্তর্জাতিক সহায়তায় রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ জামাতের অগ্রাধিকার হবে বলে জানানো হয়েছে।

ইস্তাহারে একটি উল্লেখযোগ্য নতুন প্রস্তাব হল—সংসদীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী রাজনৈতিক দলগুলির জন্য রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে অনুদান। প্রাপ্ত ভোট ও আসনের সংখ্যার অনুপাতে এই বরাদ্দ দেওয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জামাত। পাশাপাশি, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথাও বলা হয়েছে।

জামাতের ইস্তাহারে মাদক, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গঠনের অঙ্গীকার রয়েছে। দুর্নীতি দূর করতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে ব্যাপক সংস্কার, মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ এবং চাকরির আবেদনে ফি বাতিলের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তি, শিল্প, কৃষি ও উৎপাদন খাতে বৃহৎ কর্মসংস্থানের মাধ্যমে আধুনিক অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে।


ইস্তাহারে সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা, দরিদ্রদের জন্য ধাপে ধাপে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা, শিক্ষাক্ষেত্রে মৌলিক সংস্কার ও পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা চালুর কথা বলা হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা, খাদ্যে ভেজালমুক্ত নিরাপত্তা ২০৩০ সালের মধ্যে নিশ্চিত করা এবং “থ্রি জিরো” ভিশন—পরিবেশ ধ্বংস রক্ষা, দূষণ কমানো ও বন্যার ঝুঁকি কমানোর—বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।

ঢাকা থেকে বিভাগীয় শহরগুলির যাতায়াত সময় দুই থেকে তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা, নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন, প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু বিভাজনের ঊর্ধ্বে সমান নাগরিকত্বের কথাও ইস্তাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইস্তাহারে অতীতের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও বিচারবহির্ভূত ঘটনার বিচার, জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং শহিদ ও আহতদের পরিবারের পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ডা. শফিকুর রহমান তাঁর ভাষণে বলেন, “দেশ আগে, দল পরে, আর দল ব্যক্তির আগে—এই নীতিই আমরা মানি। গত ৫৪ বছরে উল্টোটা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “১৯৪৭ ছাড়া মানচিত্র পেতাম না, মানচিত্র ছাড়া ১৯৭১-এর লড়াই হতো না, আর ১৯৭১ ছাড়া আজ রাষ্ট্র মেরামতের সুযোগ আসত না—সবই পরস্পর সম্পর্কিত।” প্রতিশোধের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, “প্রতিহিংসার রাজনীতি আমাদের ধ্বংস করেছে। আমরা তরুণদের সঙ্গে নিয়ে নতুন ধরনের রাজনীতি করতে চাই।”

ইস্তাহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চিন, পাকিস্তান, তুরস্ক, ইইউ, জাপানসহ বহু দেশের কূটনীতিক, রাষ্ট্রপুঞ্জ, আইএলও, এনডিআই, আইআরআইয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীরাও অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

উল্লেখ্য, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের তত্ত্বাবধানে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। বর্তমান সমীক্ষায় বিএনপি প্রথম ও জামাত দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসমর্থন প্রাপ্ত দল হিসেবে উঠে আসছে। পরিবর্তিত এই রাজনৈতিক বাস্তবতায় জামায়াতের ইস্তাহার বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক ও আলোচনা উসকে দিল বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।