আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইরানের পোড়খাওয়া রাজনীতিক আলি লারিজানির মৃত্যুতে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির সমীকরণ এক লহমায় বদলে গেল। ইজরায়েলি হানায় তাঁর এই আকস্মিক বিদায়ে তেহরানের রাশ এখন কার্যত কট্টরপন্থীদের হাতে। কূটনৈতিক মহলের আশঙ্কা, লারিজানির মতো এক জন বাস্তববাদী নেতার এহেন চলে যাওয়া যুদ্ধের আগুন নেভানোর শেষ আশাটুকুও হয়তো কেড়ে নিল।
গত কয়েক দশক ধরে ইরানের শাসনব্যবস্থার অন্দরমহলে লারিজানি এক অপরিহার্য স্তম্ভ ছিলেন। প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই-এর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই নেতা বিবাদমান গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন করতে ওস্তাদ ছিলেন। পরমাণু কর্মসূচি থেকে শুরু করে মস্কোর দরবারে পুতিনের সঙ্গে বৈঠক- যুদ্ধের ঠিক আগে পর্যন্ত পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে দৌত্য চালিয়ে গিয়েছেন তিনি।
মার্কিন-ইজরায়েল যুদ্ধের দাপট যখন তেল-সমৃদ্ধ আরব মুলুককে গ্রাস করছে, তখন লারিজানির মৃত্যুতে আলোচনার পথ আরও বন্ধ হল বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক গবেষক এলি গেরানমায়েহ-এর মতে, "ইজরায়েল সম্ভবত বেছে বেছে তাঁদেরই নিশানা করছে, যাঁরা এই সঙ্কটের রাজনৈতিক সমাধান বের করতে পারতেন।" যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই নিয়ে সরাসরি মুখ খোলেননি।
অন্যদিকে, ইজরায়েলি প্রশাসনের এক আধিকারিক সাফ জানিয়েছেন, "আয়াতোল্লাহ শাসনের পুরোপুরি অবসান না হওয়া পর্যন্ত এই লড়াই থামবে না।"
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের শুরুতে খামেনেই-এর হত্যার পর লারিজানিই ছিলেন ইরানের যুদ্ধকালীন কৌশলের প্রধান মুখ। ইজরায়েলের চোখে তিনি ছিলেন ইরানের অলিখিত দণ্ডমুণ্ডের কর্তা।
গত শুক্রবারও তেহরানের এক জনসভায় তাঁকে শেষবার প্রকাশ্যে দেখা গিয়েছিল। অথচ তিন সপ্তাহ পেরিয়েও এই যুদ্ধ থামার কোনও লক্ষণ নেই। সোমবার ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরশাহির একটি গ্যাস গোডাউনে আগুন লাগে। তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে দাম আকাশছোঁয়া, যা নিয়ে ট্রাম্পের কপালে চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট।
লারিজানি যদিও ট্রাম্পের বশ্যতা স্বীকারের ঘোর বিরোধী ছিলেন, তবুও বিদেশিদের কাছে তিনিই আলোচনার একমাত্র 'পথ' ছিলেন। ইরানের বর্তমান অন্তর্বর্তী কাউন্সিলে লারিজানিই ছিলেন একমাত্র ব্যক্তিত্ব, যাঁর সঙ্গে হাসান রুহানির মতো মধ্যপন্থী নেতাদের সখ্য ছিল।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, লারিজানির মৃত্যু মহম্মদ-বাকের কলিবফের মতো কট্টরপন্থীদের হাত আরও শক্ত করবে। রেভল্যুশনারি গার্ডসের ঘনিষ্ঠ এই নেতা মূলত 'দমনমূলক' নীতির জন্য পরিচিত।
লারিজানি না থাকায় এখন বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বা জাভাদ জারিফের মতো অভিজ্ঞ কূটনীতিকরা আরও কোণঠাসা হয়ে পড়তে পারেন। ক্রাইসিস গ্রুপের আলি ওয়ায়েজের কথায়, "লারিজানিকে হারিয়ে তেহরান এমন এক জহুরিকে হারাল, যিনি যুদ্ধক্ষেত্রের সঙ্গে রাজনীতির ভারসাম্য রাখতে পারতেন। এর ফলে ইরানের শাসনব্যবস্থা আরও টলমলে এবং বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।"
