আজকাল ওয়েবডেস্ক:  ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট ইজরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজরায়েল কাটজ ঘোষণা করেছেন যে দেশটি গাজা সিটিতে পূর্ণ সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন একটি ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে। অভিযানের নাম রাখা হয়েছে “গিডিওন’স চারিয়টস ২”, যা চলতি বছরের মে মাসে চালানো “গিডিওন’স চারিয়টস” অভিযানের ধারাবাহিকতা। নতুন অভিযানের লক্ষ্য সম্পর্কে ইজরায়েলি সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে জানা গেছে, এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য হলো— গাজা সিটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দখল, হামাসের সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা ভেঙে দেওয়া, ইজরায়েলি বন্দিদের মুক্ত করা, এবং সাধারণ প্যালেস্তাইনিদের দক্ষিণ দিকে স্থানচ্যুত করা।

সেনা সমাবেশ ও প্রস্তুতির ঘোষণায় জানা যাচ্ছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাটজের ঘোষণায় বলা হয়েছে— ৬০,০০০ রিজার্ভ সৈন্যকে ডাকা হচ্ছে। এর আগে গাজা উপত্যকায় ২০,০০০ রিজার্ভ সৈন্য ও বিপুল সংখ্যক নিয়মিত সেনা মোতায়েন ছিল। বুধবার (২১ আগস্ট) থেকেই রিজার্ভ সৈন্যদের সমন পাঠানো শুরু হয়েছে। চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার কথা। এর আগের অভিযান, গিডিওন’স চারিয়টস ১-এ  ২০২৫ সালের ১৬–১৭ মে ইজরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার অনুমোদনে গাজাজুড়ে শুরু হয়েছিল “গিডিওন’স চারিয়টস ১”, সেই অভিযানের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল— হামাসের সামরিক ও শাসন কাঠামো ধ্বংস, প্রায় তিন-চতুর্থাংশ গাজা দখল, এবং ইজরায়েলি বন্দিদের মুক্ত করা। কয়েক মাস ধরে ইজরায়েলি বিমান ও স্থলবাহিনী গাজা জুড়ে হামলা চালায়। গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো দখলে নেওয়া হয়, সশস্ত্র পরিকাঠামো ধ্বংস করা হয়, এবং বিপুল সংখ্যক প্যালেস্তাইনি বেসামরিক মানুষ দক্ষিণাঞ্চলে সরে যেতে বাধ্য হয়।

আরও পড়ুন: চাঁদের বুকে যৌনতার ইচ্ছা! নাসার ইন্টার্নের কীর্তিতে কেঁপে উঠল আমেরিকা  

অপূর্ণ লক্ষ্য ও নতুন আক্রমণে মুখিয়ে ইজরায়েল। আগস্টের শুরুতে প্রথম অভিযান কার্যত সমাপ্ত ঘোষণা করা হলেও ইজরায়েল তার পূর্ণ লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। হামাসকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা যায়নি। সব বন্দি মুক্ত হয়নি। বৃহৎ পরিসরে প্যালেস্তাইনি বেসামরিক স্থানচ্যুতিও পরিকল্পনামতো হয়নি। এসব কারণেই নতুন করে শুরু হতে যাচ্ছে “গিডিওন’স চারিয়টস ২”, যা মূলত গাজা সিটিতে পূর্ণ সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবে।

এই অভিযানকে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।  যদিও ইজরায়েলি সরকার এ অভিযানের যৌক্তিকতা তুলে ধরছে, আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা ও কূটনৈতিক মহল আশঙ্কা করছে, নতুন এ অভিযান গাজা উপত্যকায় আরও ব্যাপক বেসামরিক হতাহতের ঘটনা, অবকাঠামো ধ্বংস ও মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনবে। ইজরায়েল–প্যালেস্তাইন সংঘাত আধুনিক বিশ্বরাজনীতির সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল সমস্যাগুলোর একটি। ১৯৪৮ সালে ইজরায়েল রাষ্ট্র গঠনের পর থেকেই প্যালেস্তিনিদের ভূমি দখল, উচ্ছেদ ও শরণার্থী জীবনে ঠেলে দেওয়া শুরু হয়। পরবর্তী যুদ্ধগুলোয় ইজরায়েল পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা ও পূর্ব জেরুসালেমের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল দখল করে নেয়।

আজও সেই দখলদারিত্ব ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত। গাজায় প্রায় দু’মিলিয়ন মানুষ অবরুদ্ধ অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে; পানি, বিদ্যুৎ ও চিকিৎসা সেবার মতো মৌলিক অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত। অপরদিকে, ইজরায়েল তার নিরাপত্তার যুক্তি দেখিয়ে আগ্রাসী সামরিক অভিযান চালাচ্ছে, যার ফলে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ নিহত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কথা বলা হলেও বাস্তবে ইজরায়েলের বসতি সম্প্রসারণ ও দমননীতি সেই সম্ভাবনাকে ক্ষীণ করে তুলেছে। এই সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিকে নয়, বৈশ্বিক মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নকেও গভীরভাবে আলোড়িত করছে।