আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইংল্যান্ডের কেন্ট কাউন্টির সবুজ গাছপালায় ঘেরা শান্ত গ্রাম প্লাকলি। দিনের আলোয় একে দেখলে মনে হবে ঠিক যেন গল্পের বই থেকে উঠে আসা কোনও এক মনোরম ব্রিটিশ পল্লি। এক হাজার মানুষের বাস এই ছোট্ট গ্রামে, যেখানে ছোট ছোট কুটির আর সাজানো বাগান পর্যটকদের মন ভরিয়ে দেয়। কিন্তু সূর্য ডুবলেই এই চেনা রূপ পাল্টে গিয়ে এক বিভীষিকাময় রূপ ধারণ করে প্লাকলি। লোকমুখে প্রচলিত আছে, এই গ্রামে জীবিত মানুষদের পাশাপাশি ১৫টি অশরীরী আত্মা নিয়মিত ঘুরে বেড়ায়। কোনও রূপকথা নয়, বরং গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস একসময় এই গ্রামকে ‘ব্রিটেনের সবচেয়ে ভুতুড়ে গ্রাম’-এর তকমা দিয়েছিল।
প্লাকলির সবচেয়ে আতঙ্কের নাম ‘স্ক্রিমিং উডস’ বা চিৎকার করা অরণ্য। সম্প্রতি অনেক সাহসী মানুষ রাতের বেলা এই জঙ্গলে ক্যাম্পিং করতে গিয়ে রক্ত হিম করা অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন। গভীর রাতে এখান থেকে নারী-পুরুষের আর্তনাদ শোনা যায়। বলা হয়, অতীতে এই জঙ্গলে পথ হারিয়ে যারা মারা গিয়েছিলেন, তাদের আত্মা আজও মুক্তির আশায় এখানে চিৎকার করে ফেরে। এই বনের গা ছমছমে পরিবেশ এতটাই ভয়ংকর যে দিনের বেলাতেও মানুষ একা সেখানে ঢুকতে সাহস পায় না।
গ্রামের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে লুকিয়ে আছে এক একটি ভৌতিক ইতিহাস। ‘ফ্লাইট কর্নার’ নামক স্থানে দেখা মেলে ১৮ শতকের এক হাইওয়েম্যান বা দস্যুর ছায়ামূর্তি। লোকগাথা অনুযায়ী, গ্রামের পাহারাদাররা তাকে একটি ওক গাছের সাথে তলোয়ার দিয়ে বিঁধে হত্যা করেছিল। আজও নাকি সেখানে সেই তলোয়ার যুদ্ধের ছায়া এবং তার করুণ পরিণতির পুনরাবৃত্তি ঘটে। আবার ডিকি বাসের গলিতে দেখা যায় এক স্কুলশিক্ষকের ঝুলন্ত মৃতদেহ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন, আর কয়েক সপ্তাহ পর জনৈক ডিকি বাস তার পচাগলা দেহ উদ্ধার করেন। মজার ব্যাপার হল, সেই ডিকি বাসের আত্মাও নাকি এখন গ্রামের পরিত্যক্ত উইন্ডমিলে ঘুরে বেড়ায়, বিশেষ করে ঝড়বৃষ্টির ঠিক আগে তাকে সেখানে দেখা যায়।
গ্রামবাসীদের জন্য ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা এখানে খুব সাধারণ ঘটনা। মাল্টম্যান্স হিলে প্রায়ই দেখা মেলে এক রহস্যময় ঘোড়ার গাড়ির। ১৯৯৭ সালে এক গাড়িচালক পিচঢালা রাস্তায় ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনে এতটাই ঘাবড়ে গিয়েছিলেন যে তার গাড়ি প্রায় দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল। শুধু রাস্তাঘাট নয়, প্লাকলির পুরনো গির্জা সেন্ট নিকোলাসও পিছিয়ে নেই। এখানে ‘রেড লেডি’ বা লেডি ডেরিং-এর আত্মা ঘুরে বেড়ায়। ১১০০ সালের দিকে তাকে একটি সিসার কফিনে একটি লাল গোলাপসহ সমাধিস্থ করা হয়েছিল। বলা হয়, তিনি আজও তার মৃত সন্তানের কবর খুঁজে বেড়াচ্ছেন। গির্জার ভেতর আবার ‘হোয়াইট লেডি’রও দেখা মেলে, যার অশরীরী উপস্থিতি ১৯৫২ সালে পুড়ে যাওয়া সুরেনডেন ডেরিং প্রাসাদেও টের পাওয়া যেত।
প্লাকলির ভূতদের তালিকাটি বেশ দীর্ঘ। এখানে ইটের ভাটায় দেওয়াল ধসে মারা যাওয়া শ্রমিকের আর্তনাদ যেমন শোনা যায়, তেমনি পিনক ব্রিজের ওপর দেখা যায় এক জিপসি মহিলার ছায়া, যে আপন মনে পাইপ টানতে টানতে অদৃশ্য হয়ে যায়। গ্রামের দুটি পাব— ‘ব্ল্যাকস্মিথস আর্মস’ এবং ‘ডেরিং আর্মস’— পর্যটকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় হলেও সেখানকার অদৃশ্য খদ্দেরদের কথা শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। ডেরিং আর্মস পাবে তো এক ঘোমটা পরা মহিলার আত্মা এতটাই স্পষ্ট যে, অনেক সময় খদ্দেররা তাকে রক্ত-মাংসের মানুষ ভেবে ভুল করেন। কেউ বিষাক্ত বেরি ফল খেয়ে আত্মহত্যা করা যুবতী, আবার কেউবা পার্ক উডের গাছে ঝুলে থাকা কর্নেলের আত্মা— প্লাকলির প্রতিটি ধূলিকণায় যেন মিশে আছে মৃত্যু আর হাহাকারের গল্প। যারা অলৌকিক কিছু দেখতে ভালোবাসেন, তাদের কাছে প্লাকলি হয়তো রোমাঞ্চের জায়গা, কিন্তু অন্ধকার নামলে এই গ্রামের নিস্তব্ধতা যা জানান দেয়, তা সাধারণ মানুষের সহ্য করার ক্ষমতার বাইরে।
















