আজকাল ওয়েবডেস্ক: ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রতিবেশী দেশটির ইতিহাসে এই নির্বাচনকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। প্রধানত দু'টি প্রধান রাজনৈতিক দল, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (জামাত নামেই জনপ্রিয়) ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর মধ্যে ভোটের লড়াই। এই দুই দলই ভোটারদের কাছে পৌঁছতে মরিয়া। উল্লেখ্য, বছরের পর বছর ধরে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনকালে, দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটির বিরোধী দলগুলোর (মূলত- জামাত ও বিএনপি) নির্বাচনে তেমন উপস্থিতি চোখে পড়ত না। হয় তারা নির্বাচন বর্জন করত অথবা শীর্ষ নেতৃত্বের গণগ্রেপ্তারের মাধ্যমে তাদের কোণঠাসা করে রাখা হত।
বৃহস্পতিবারের ভোটের আগে পরিস্থিতি পাল্টে গিয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ৭টায় প্রচাররের আনুষ্ঠানিক সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে, সোমবারই দলগুলোর জন্য ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর শেষ সুযোগ। হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি এবং মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞার পর, বাংলাদেশে একসময়ের মিত্র জামায়াত ও বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি দুই রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উত্থান ঘটেছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নির্বাচনে জয়ী হবে বলে আশা করা হচ্ছে। যদিও ইসলামপন্থী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন একটি জোট শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে। ৩০ বছরের কম বয়সী তরুণ কর্মীদের পরিচালিত একটি নতুন দল হাসিনা-বিরোধী রাজপথের আন্দোলনকে নির্বাচনী শক্তিতে রূপান্তরিত করতে ব্যর্থ হওয়ার পর জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বিশ্বাস করেন যে, ভোটে জামায়াত চমক দেখাতে পারে। কারণ দলটি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তাদের সেরা পারফরম্যান্স করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২০২৪ সালে ইউনূস সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই জামায়াতের কার্যক্রমের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনও ফের এই দলকে নথিভুক্তকরণ দেয়। তাই ভোটের আগে ভাল অবস্থানেরয়েছে জামাত।
তবে, ১৭ বছর রাজনৈতিক নির্বাসনে থাকার পর তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন বিএনপির কর্মীদের নতুন করে উজ্জীবিত করেছে।প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুও বিএনপির পক্ষে একটি সহানুভূতি তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতি নির্বাচনটি একটি হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে পরিণত হতে চলেছে। জামায়াত এবং বিএনপি নির্বাচনী প্রচারর জনসভায় একে অপরের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিচ্ছে।
দোদুল্যমান ভোটার ধরার প্রতিযোগিতা:
হাসিনার আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ায়, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে তাঁর সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সাহায্যরত অনেক তরুণ বলছেন, আসন্ন নির্বাচনটি হবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির ২০০৯ সালের পর প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন। ২০০৯-এর পর ১৫ বছরের শাসন করেছিলেন শেখ হাসিনা।
বিএনপি এবং জামায়াত উভয়ই আওয়ামী লীগের সমর্থকদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে, বিশেষ করে সেই আসনগুলোতে যেখানে হাসিনার দলের ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ের বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা এবং হিন্দু রাজনীতিবিদ রমেশ চন্দ্র সেনের কারাগারে মৃত্যুর পর উভয় দলের শীর্ষ নেতারা তাঁর বাড়িতে ছুটে যান, যা এই পরিবর্তনশীল ভোটব্যাঙ্কের গুরুত্বকে নির্দেশ করে।
রমেশ চন্দ্র সেন পাঁচবারের সংসদ সদস্য ছিলেন এবং এই অঞ্চলে তাঁর ব্যাপক প্রভাব ছিল। যেহেতু দলটি প্রতিযোগিতার বাইরে, তাই উভয় দলই চায় আওয়ামী লীগের সমর্থকরা তাঁদের ভোট দিক। একটি হাড্ডাহাড্ডি নির্বাচনে এই দোদুল্যমান ভোটগুলোই নির্ধারক ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
জামায়াত বনাম বিএনপি: ঐতিহ্যের লড়াই
ভারতীয় বৈদ্যুতিন সংবাদ মাধ্যম এনডিটিভি উভয় প্রধান দলের সমাবেশ পর্যবেক্ষণ করেছে এবং তাদের সমর্থকদের সঙ্গে কথা বলেছে। একজন বিএনপি সমর্থক এনডিটিভিকে বলেন, "জামায়াত ইতিহাসকে অস্বীকার করতে পারে না এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তাদের ভূমিকা অস্বীকার করতে পারে না, যেখানে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশিকে নিশানা করে হত্যা করা হয়েছিল। এটা শেখ হাসিনা ২০২৪ সালে তাঁর সরকারের নৃশংস দমন-পীড়নের সময় যা করেছিলেন, তার থেকে কোনও অংশে ভিন্ন ছিল না।"
এদিকে, জামায়াতের সমর্থকরা দাবি করেন, "শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তারেক রহমান আশেপাশে ছিলেন না, কারণ তিনি দেশ ছেড়ে রাজনৈতিক নির্বাসনে ছিলেন এবং শেখ হাসিনা সরকারের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল জামায়াত, যে সংগঠনটিকে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করেছিল। মানুষ দেখেছে কে হাসিনার বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। আমরাই সেই লড়াই করেছি।"
জামায়াতের প্রধান শফিকুর রহমানও বিএনপি প্রধান তারেক রহমানকে কটাক্ষ করে বলেন, "বাংলাদেশের রাজনীতিকে একটি বিশেষ সুবিধা ও দুর্নীতির ব্যবস্থায় পরিণত করা হয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক নেতৃত্ব পারিবারিক সম্পত্তির মতো হস্তান্তর করা হয়। এই দেশ কোনও পারিবারিক সম্পত্তি নয়। আমি বংশগত রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করি। নেতৃত্ব অর্জন করতে হয়, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যায় না।"
পাল্টা তারেক রহমান, জামায়াতের কটাক্ষের সরাসরি জবাব দেওয়া থেকে বিরত থাকেন, কিন্তু তাঁর দলের নেতারা পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে কোনও ছাড় দেননি এবং জনতাকে মনে করিয়ে দেন যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যখন বাংলাদেশিদের উপর নৃশংসতা চালাচ্ছিল, তখন জামায়াতের নেতারা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল।
গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু ভোট
বর্তমান পরিস্থিতি একটি হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের নির্বাচনের ইঙ্গিত দেওয়ায়, সব দলই প্রধান সংখ্যালঘু সম্প্রদায় - হিন্দুদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। অনেকেই বিশ্বাস করেন, হিন্দু ভোট শেষ পর্যন্ত নির্ধারক শক্তি হয়ে উঠতে পারে। মন্দির পরিদর্শন থেকে শুরু করে শিক্ষাক্ষেত্রে হিন্দুদের অবদানের প্রশংসা চলছে। জামায়াত ও বিএনপি উভয়ই এই সম্প্রদায়কে নিরাপত্তা ও সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যদিও নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে উগ্রপন্থী শক্তির হাতে হিন্দুরা ক্রমাগত আক্রমণের শিকার হচ্ছেন।
কিন্তু জামায়াতের কট্টরপন্থী ও উগ্রবাদী ভাবমূর্তির কারণে হিন্দুদের মধ্যে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা বেশি থাকতে পারে। সংখ্যালঘুদের ভোট পাওয়ার এই প্রচেষ্টা শুরু হয় যখন সম্প্রতি জামায়াতের একজন প্রার্থী শিক্ষা বিস্তারে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অর্থায়নের জন্য হিন্দুদের প্রশংসা করে ঘোষণা করেন যে, "এই অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে হিন্দুদের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না।"
যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উগ্রপন্থী শক্তির কর্মকাণ্ডের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হিন্দুদের মন জয় করতে হলে জামায়াতকে শুধু কথার চেয়ে আরও অনেক বেশি কিছু করতে হবে। হিন্দু ভোটের ক্ষেত্রে বিএনপি কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশের নির্বাচন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ২৯৯টি সংসদীয় আসনে সকাল ৭.৩০ থেকে বিকেল ৪.৩০ পর্যন্ত স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ও কাগজের ব্যালটের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ করা হবে। নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে হিংসা ছড়িয়ে পড়ায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি নিরাপদ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঘোষণা করেছে।
নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই সনদের ওপর একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে - এই দলিলটি সম্ভবত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করবে। শেখ হাসিনা সরকারকে উৎখাতকারী প্রতিবাদের এক বছরেরও বেশি সময় পর ২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। যদি গণভোট পাশ হয়, তবে কয়েকটি মূল বিষয়ে কোনও ঐকমত্য হয়নি। তবুও রাজনৈতিক দলগুলো এর ধারাগুলো মেনে চলতে বাধ্য থাকবে।
২০২৫-এর ১৩ নভেম্বর, মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জুলাই জাতীয় সনদ (সাংবিধানিক সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে। গণভোটটি চারটি সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবের ওপর পরিচালিত হবে এবং ভোটারদের সম্মিলিতভাবে চারটি প্রস্তাবের ওপর 'হ্যাঁ' বা 'না' বলে ভোট দিতে হবে।
চীনের ভূমিকা
বিশ্লেষকরা বলেছেন, নির্বাচনের ফলাফল আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশে চীন ও ভারতের ভূমিকাকেও প্রভাবিত করবে। হাসিনাকে ভারতপন্থী হিসেবে দেখা হত এবং ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি নয়াদিল্লি পালিয়ে আসেন। এ দেশেই তিনি এখনও অবস্থান করছেন। হিসানার পদচ্যূতির পরই থেকে বাংলাদেশে বেজিংয়ের প্রভাব বেড়েছে।
নয়াদিল্লির প্রভাব কমলেও অবশ্য কিছু বিশ্লেষক মনে করেন যে, জামায়াতের চেয়ে বিএনপি ভারতের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি সুসম্পর্ক বজায় রাখে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার পাকিস্তানের দিকে আরও ঝুঁকে পড়তে পারে। পাকিস্তান একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী। এছাড়াও, জামায়াতের সহযোগী জেনারেশন-জেড দলটি বলেছে যে, বাংলাদেশে "নয়াদিল্লির আধিপত্য" তাদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ। জেনারেশন-জেড এর নেতারা সম্প্রতি চীনা কূটনীতিকদের সঙ্গে দেখাও করেছেন।
ইসলামী নীতি দ্বারা পরিচালিত সমাজ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো জামায়াত বলেছে যে, তারা কোনও বিশেষ দেশের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট নয়।
বিএনপির তারেক রহমান বলেছেন যে, তাঁর দল সরকার গঠন করলে, তাঁরা এমন যেকোনও দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখবে যারা "আমার জনগণ এবং আমার দেশের জন্য যা উপযুক্ত স্বার্থ বজায় রাখবে।"
বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশ এবং চরম দরিদ্র বাংলাদেশ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল রিজার্ভ এবং ধীরগতির বিনিয়োগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা ২০২২ সাল থেকে এটাকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং বিশ্বব্যাংক-সহ বিভিন্ন উৎস থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বড় আকারের বৈদেশিক আৎ্থির ধার চাইতে বাধ্য করেছে।
ঢাকা-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক 'কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন' এবং 'বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক অপিনিয়ন স্টাডিজ'-এর একটি সমীক্ষা অনুসারে, ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের মধ্যে দুর্নীতিই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়, এরপরই রয়েছে মূল্যস্ফীতি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের ইসলামী আদর্শের চেয়েও তাদের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তিই দলটির পক্ষে একটি বড় কারণ।
সমীক্ষায় বলা হয়েছে, "ভোটাররা নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ধর্মীয় বা প্রতীকী বিষয়ের চেয়ে দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এবং এমন নেতাদের প্রতি স্পষ্ট প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন যাঁরা যত্নশীল, যোগ্য এবং জবাবদি করতে বিশ্বাসী।"
তা সত্ত্বেও, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে বিএনপির রহমানকেই পরবর্তী সরকার প্রধান হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট এগিয়ে আসে, তবে এর চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান শীর্ষ পদের জন্য বিবেচিত হতে পারেন।
