আজকাল ওয়েবডেস্ক: পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে এক মর্মান্তিক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে জোর করে বিয়ে, নারীর অধিকার এবং পারিবারিক নিপীড়নের প্রশ্ন। এক ২১ বছর বয়সি তরুণী, যিনি নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আয়োজিত বিয়েতে অসন্তুষ্ট ছিলেন, তাঁর স্বামীর দুধে বিষ মেশানোর অভিযোগে খুনের মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন। তবে সেই বিষাক্ত দুধ পরে স্বামী পান না করে তাঁর পরিবারের সদস্যরা পান করায় একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছে পূর্ব পাঞ্জাবের মুলতান শহরের কাছে একটি গ্রামীণ এলাকায়। জেলা পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত তরুণীর নাম আসিয়া বিবি। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) সূত্রে জানা গেছে, আসিয়া বিবি তাঁর বর্তমান স্বামীর কাছ থেকে আগেও দু’বার বিয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তৃতীয়বার তাঁর পরিবার তাঁকে জোর করে ওই ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে দেয়। আসিয়ার ইচ্ছা ছিল অন্য এক যুবককে বিয়ে করার।

পুলিশ জানায়, বিয়ের কয়েক দিনের মধ্যেই আসিয়া স্বামীর বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বাবা-মায়ের বাড়িতে ফিরে যান এবং সেখানে থাকতে দেওয়ার জন্য অনুনয় করেন। কিন্তু তাঁর বাবা-মা তাঁকে আবার স্বামীর বাড়িতে ফিরিয়ে যেতে বাধ্য করেন। স্বামীর বাড়িতে তিনি শ্বশুর-শাশুড়ি ও অন্যান্য আত্মীয়দের সঙ্গে একসঙ্গেই থাকতেন।

জেলা পুলিশ প্রধান সোহেল হাবিব তাজিক এপিকে জানিয়েছেন, এরপর আসিয়া তাঁর প্রেমিক শহিদ লাশারির কাছ থেকে একটি বিষাক্ত পদার্থ সংগ্রহ করেন। সেই বিষ তিনি স্বামীর জন্য রাখা দুধে মিশিয়ে দেন। তবে স্বামী সেই দুধ পান করেননি। অজান্তেই তাঁর মা সেই দুধ ব্যবহার করে দইয়ের লাচ্ছি তৈরি করেন, যা পরিবারের ২৭ জন সদস্যকে পরিবেশন করা হয়।

বিবিসির খবর অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ওই লাচ্ছি পান করার কিছুক্ষণের মধ্যেই আটজনের মৃত্যু হয়। পরবর্তী কয়েক দিনে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং এক সপ্তাহের মাথায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৭ জনে। এপি জানায়, এখনও অন্তত ১০ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

মঙ্গলবার আসিয়া বিবিকে আদালতে হাজির করা হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে খুনের অভিযোগ গঠন করা হয়। আদালত চত্বরে উপস্থিত সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “আমি বারবার আমার বাবা-মাকে অনুরোধ করেছিলাম যেন আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমাকে বিয়ে না দেওয়া হয়। ইসলাম ধর্মও আমাকে নিজের পছন্দের মানুষকে বেছে নেওয়ার অধিকার দেয়। কিন্তু তাঁরা আমার কোনও কথা শোনেননি এবং আত্মীয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে দিয়ে দেন।”

আসিয়া স্বীকার করেছেন যে তাঁর প্রেমিকই তাঁকে বিষ দিয়েছিল এবং সেটিই তিনি দুধে মিশিয়েছিলেন। তবে তাঁর দাবি, অন্য কেউ সেই দুধ পান করবে এমনটা তিনি ভাবেননি। তিনি মৃতদের জন্য অনুতাপ প্রকাশ করেছেন।

এনপিআরের ইসলামাবাদ প্রতিনিধি দিয়্যা হাদিদ তাঁর প্রতিবেদনে পাকিস্তানের সামাজিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, পাকিস্তানে এখনও পরিবার দ্বারা নির্ধারিত বিয়ের চল খুবই সাধারণ, বিশেষ করে গ্রামীণ ও রক্ষণশীল সমাজে। অনেক ক্ষেত্রে কন্যাদের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তালাককে গভীর লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখা হয়, ফলে বহু মহিলা হিংসা  বা অসুখী দাম্পত্য জীবনেও সম্পর্ক ভাঙতে পারেন না।

এছাড়া কন্যাসন্তানকে অনেক পরিবার ‘বোঝা’ হিসেবেও দেখে, কারণ বিয়ের অধিকাংশ খরচ তাদেরই বহন করতে হয়। এতে পরিবার ঋণের ভারে জর্জরিত হয় এবং মেয়েকে সমর্থন করা আরও কঠিন হয়ে ওঠে। তবে প্রতিবেদনে এটাও উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্বামীকে হত্যার চেষ্টা করার মতো ঘটনা পাকিস্তানে তুলনামূলকভাবে বিরল। বাস্তবে দেশটি মহিলাদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত, যেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হিংসার শিকার হন মেয়েরাই।

এই ভয়াবহ ঘটনায় পাকিস্তান জুড়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, জোর করে  বিয়ে, সামাজিক চাপ এবং নারীর স্বাধীনতার সীমা শেষ পর্যন্ত কত দূর পর্যন্ত প্রাণঘাতী পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে।