আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইরান ও ইজরায়েল-আমেরিকার যৌথ সংঘাতের জেরে বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে আগুন। যুদ্ধের জেরে চরম জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুতের ঘাটতি। এই ঘাটতি সামাল দিতে কার্যত 'জরুরি' অবস্থার পথে হাঁটল দক্ষিণ এশিয়ার তিন দেশ- বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বাঁচাতে একগুচ্ছ কড়া পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেছে এই দেশগুলি।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে আগামী সোমবার থেকে সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে আনা হয়েছে ইদ-উল-ফিতারের ছুটিও। শিক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে, আবাসিক হল, ক্লাসরুম ও এসি বন্ধ থাকলে বিদ্যুতের খরচ অনেকটা কমবে। পাশাপাশি রাস্তায় গাড়ির চাপ কমলে বাঁচবে জ্বালানিও। এর মধ্যেই তেল মজুত করার হিড়িক রুখতে জ্বালানি বিক্রির ওপর দৈনিক সীমা বেঁধে দিয়েছে ঢাকা।
প্রতিবেশী পাকিস্তানেও ছবিটা তথৈবচ। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, যাতায়াত কমাতে আগামী দুই সপ্তাহ স্কুল বন্ধ থাকবে। এমনকী বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস হবে অনলাইনে। সরকারি কর্মীদের তেলের বরাদ্দে ৫০ শতাংশ কাটছাঁট করা হয়েছে। রাস্তায় সরকারি গাড়ির সংখ্যা এক ধাক্কায় ৬০ শতাংশ কমিয়ে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জরুরি পরিষেবা বাদে বাকি সরকারি দপ্তরে সপ্তাহে চার দিন কাজ হবে এবং অর্ধেক কর্মী বাড়ি থেকে কাজ করবেন। শাহবাজের কথায়, “অর্থনীতি বাঁচাতে এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেই হতো।”
এদিকে অর্থনৈতিক সংকটে জেরবার শ্রীলঙ্কাতেও ফের বাড়ল তেলের দাম। কলম্বোর সরকারি তেল সংস্থা ‘সেপেটকো’ জানিয়েছে, ডিজেল, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটার প্রতি ১৩ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জোগান ব্যাহত হওয়ায় এই অগ্নিমূল্য পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল।
প্রসঙ্গত, বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ আবহে রান্নার গ্যাসের দাম বেড়েছে। এর জেরে শুরু হয়েছে আকাল। বানিজ্যিক সিলিন্ডারের তীব্র সংকটে জেরবার দেশের কয়েক হাজার হোটেল ও রেস্তোরাঁ। পরিস্থিতি এতটাই সঙ্গিন যে, মুম্বই, বেঙ্গালুরু এবং চেন্নাইয়ের হোটেল মালিকরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন- মঙ্গলবার, ১০ মার্চের মধ্যে গ্যাস না মিললে তাঁরা দোকান গোটাতে বাধ্য হবেন।
ইরান ও আমেরিকার দ্বন্দ্বে মধ্য এশিয়ার পরিস্থিতি এখন তপ্ত। বিশ্ববাজারে তেলের দাম চড়ছে। তার আঁচ এসে পড়েছে ভারতের হেঁশেলে। চেন্নাই এবং বেঙ্গালুরুর হোটেল সংগঠনগুলোর দাবি, এলপিজি সরবরাহকারী সংস্থাগুলো সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে তাদের ভাণ্ডার শূন্য।
এর ফলে রেস্তোরাঁ তো বটেই, আইটি পার্ক বা কলেজের হস্টেলের খাবার সরবরাহও বন্ধ হওয়ার মুখে। বিপাকে পড়েছেন সেই সব সাধারণ মানুষ, পড়ুয়া বা চিকিৎসকরা, যাঁরা প্রতিদিন হোটেলের খাবারের ওপর নির্ভর করেন।
সংকট দানা বেঁধেছে মুম্বই এবং গুরুগ্রামেও। মুম্বইয়ের দাদর বা আন্ধেরির অনেক রেস্তোরাঁ গ্যাস বাঁচাতে মেনু থেকে বাদ দিয়েছে এমন সব পদ, যা রাঁধতে অনেক সময় লাগে।
কমিয়ে দেওয়া হয়েছে দোকানের কাজের সময়ও। জানা গিয়েছে, পুণেতে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, ঘরোয়া গ্যাসের জোগান ঠিক রাখতে শহরের গ্যাস-চালিত শ্মশানগুলোও আপাতত বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে পুরসভা।
এদিকে গত সপ্তাহেই সিলিন্ডারের দাম ১১৫ টাকা এবং ঘরোয়া গ্যাসের দাম ৬০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এর জেরে নাজেহাল হোটেল ব্যবসায়ীরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। ‘ন্যাশনাল রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া’ -এর স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, দ্রুত সুরাহা না হলে রেস্তোরাঁ শিল্পে বিপর্যয় নেমে আসবে।
চাপ সামলাতে ময়দানে নেমেছে কেন্দ্রও। সোমবার পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক তেল শোধনাগারগুলোকে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। তবে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে ঘরোয়া সিলিন্ডারকে।
কালোবাজারি রুখতে একটি সিলিন্ডার বুক করার ২৫ দিন পর দ্বিতীয়টি বুক করার নিয়ম চালু করা হয়েছে। হোটেলগুলোর সমস্যার কথা মাথায় রেখে একটি বিশেষ কমিটিও গঠন করেছে সরকার। এখন দেখার, এই পদক্ষেপে হোটেলের উনুন আবার কবে স্বাভাবিকভাবে জ্বলে ওঠে।
