আজকাল ওয়েবডেস্ক: দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে গাজা উপত্যকা শাসন করার পর অবশেষে ক্ষমতা ছাড়ার ঘোষণা দিল প্যালেস্তাইনের গোষ্ঠী হামাস। সোমবার এক বড় সংবাদ সম্মেলনে তারা জানায়, গাজার বর্তমান প্রশাসন ভেঙে দিয়ে একটি নতুন ‘টেকনোক্র্যাট’ বা অরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ কমিটির হাতে শাসনভার তুলে দেওয়া হবে। হামাসের এই সিদ্ধান্তকে গত বছর মার্কিন মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির দিকে একটি বড় ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে মাঠের বাস্তবতায় ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ এবং রাজনৈতিক জটিলতার কারণে এই প্রক্রিয়া কতটা সফল হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েই গেছে।
হামাসের এই আকস্মিক পদক্ষেপের পেছনে বড় একটি রাজনৈতিক চাল রয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই হামাস এই ঘোষণা দিয়েছে। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিল যে হামাস গাজার ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। কিন্তু এই ঘোষণার মাধ্যমে হামাস বিশ্বমঞ্চে, বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে প্রমাণ করতে চাইছে যে তারা শান্তিপ্রক্রিয়া ও গাজা পুনর্গঠনের জন্য ক্ষমতা হস্তান্তর করতে আন্তরিকভাবে প্রস্তুত। এখন বল মূলত ইসরায়েলের কোর্টে। গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের মহাপরিচালক ইসমাইল আল-থাওয়াবতা আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, তারা আশা করছেন এই পদক্ষেপের পর অন্তত গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ হবে, সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করা হবে এবং মানবিক সহায়তার জন্য সীমান্ত পারাপারগুলো খুলে দেওয়া হবে।
হামাস যে নতুন কমিটির হাতে ক্ষমতা দিচ্ছে, সেটির নাম ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ বা এনসিএজি (NCAG)। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাবের অধীনে এই অন্তর্বর্তীকালীন বেসামরিক কমিটি গঠন করা হয়। বর্তমানে কায়রোতে সদর দপ্তর থাকা এই কমিটির নেতৃত্বে আছেন প্যালেস্তাইনের টেকনোক্র্যাট আলী আবদেল হামিদ শাথ। হামাস জানিয়েছে, গাজার দৈনন্দিন সেবা খাতের সাধারণ সরকারি কর্মচারীরা সবাই এই নতুন কমিটির অধীনে কাজ করতে প্রস্তুত। তবে সমস্যা হলো, ইসরায়েল এখনো এই কমিটির সদস্যদের গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। উপরন্তু, এনসিএজি-র প্রধান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, গাজায় একটি মাত্র বৈধ প্রশাসন এবং একক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা পুলিশ বাহিনী না থাকলে তাদের পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়।
আর এখানেই দেখা দিয়েছে মূল দ্বিমত— যা এই পুরো শান্তিপ্রক্রিয়াকে আটকে রেখেছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদন সার হামাসের এই ঘোষণাকে একটি ‘চালবাজি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, হামাস আসলে লেবাননের হিজবুল্লাহ মডেল গাজায় নকল করতে চাইছে। অর্থাৎ, আবর্জনা পরিষ্কার বা পৌরসভার মতো বেসামরিক কাজগুলো করবে টেকনোক্র্যাট সরকার, আর পেছনের আসল সামরিক ক্ষমতা ও অস্ত্র থাকবে হামাসের হাতেই। ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ট্রাম্পের ২০ দফার শান্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী হামাসকে পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণ করতে হবে এবং গাজায় 'এক কর্তৃপক্ষ, এক আইন ও এক অস্ত্র' নীতি কার্যকর হতে হবে।
অন্যদিকে হামাসের যুক্তি, ইসরায়েল নিজেই চুক্তির প্রথম শর্ত মানেনি। গত অক্টোবর মাসে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত গাজায় এক হাজারেরও বেশি প্যালেস্তিনীয় নিহত হয়েছেন, আর সব মিলিয়ে ২০২৩ সালের পর থেকে নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৭৩ হাজার। এখনো গাজার ৭০ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে এবং প্রতিদিন সেখানে হামলা চলছে। হামাসের দাবি, ইসরায়েল যতক্ষণ না গাজা থেকে সেনা সরাচ্ছে এবং পর্যাপ্ত ত্রাণ ঢুকতে দিচ্ছে, ততক্ষণ এই প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় ধাপে যাওয়া সম্ভব নয়। সব মিলিয়ে, হামাস সরকার বিলুপ্তির এই বড় ঘোষণা গাজার সাধারণ মানুষের জীবনে শান্তি ফিরিয়ে আনবে, নাকি এটি কেবলই কাগজ-কলমের আরেকটি ব্যর্থ চুক্তি হয়ে থাকবে— তা অনেকটাই নির্ভর করছে ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।















